উরসে চন্দনগন্ধ ,ইমানুজ্জামান মহীর স্মৃতির ঝাঁপি
- সময় : ১১:০৯:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ মে ২০২৬
- / ৪ ভিউ
কুমার সৌরভ-মানুষ স্বভাবগতভাবে স্মৃতিকাতর। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই স্মৃতিকাতরতাও বাড়তে থাকে। জীবনের শেষপ্রান্তে এই স্মৃতিগুলোই ব্যক্তির বেঁচে থাকার প্রাণশক্তি হিসেবে কাজ করে। কেউ কেউ এই স্মৃতিগুলোর ভাষ্য বা লেখ্য রূপ দিতে পারেন। যারা পারেন না তাঁরা নিজে নিজে ফেলে আসা দিনগুলো স্মৃতি রোমন্থন করে পুলকানন্দ লাভ করেন। স্মৃতিনির্ভর অনেক বইয়ের কথা আমাদের জানা আছে। বিশেষ করে নানা ক্ষেত্রে যাঁরা বিখ্যাত হয়েছেন তাঁদের ঘটনাবহুল জীবনের অজানা কথা জানার আগ্রহ মানুষের অপরিসীম। সম্ভবত এ কারণে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিই স্মৃতিনির্ভর আত্মকথা লিখে গেছেন। সেগুলো পড়ে আমরা লেখকের সমকালীন সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এমন সব অজানা কাহিনী জানতে পারি যা আমাদের জানার জগতকে আরও সমৃদ্ধ করে। যাদের লেখালেখির হাত ভালো, তাঁরা এসব স্মৃতি পাঠকের নিকট শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করতে পারেন, সেগুলোর আলাদা সাহিত্যমূল্য থাকে। পাঠককে বর্ণনার গভীরে হারিয়ে যেতে সক্ষম হয়। একটি ছোট ঘটনাকেও এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যা সরস বর্ণনাগুণে পাঠের তৃষ্ণা নিবারণ করে। ইমানুজ্জামান মহী আমাদের শহরের এক আশ্চর্য ব্যক্তি, যিনি তাঁর কৈশোর থেকে যৌবন পর্যন্ত নানা তৎপরতায় সুনামগঞ্জে সুপরিচিত হয়ে গিয়েছিলেন। ইমানুজ্জামান মহী যখন এই শহরের সড়ক দাপিয়ে বেড়াতেন সেই সত্তর দশক থেকে আশির দশকের সামাজিক প্রেক্ষাপট এখনকার মতো ছিলো না। সুনামগঞ্জ শহরটিও এখনকার মতো এতো জনবহুল, ঘিঞ্জি ও ব্যস্ত ছিলো না। তখন পুরো শহর মিলে একটি আত্মীয়তার বন্ধন ছিলো। এক বাসার মানুষ অন্য বাসার মানুষকে চিনতেন-জানতেন। এখনকার মতো পাশের বাসার খবর না জানা মানুষ তখন খোঁজে পাওয়া যেতো না। এই ভালোবাসার শহরে মহী ও তাঁর বন্ধু সহপাঠীরা কখন কী করতেন, কে কেমন ছিলো, তখনকার রাজনৈতিক সামাজিক অবস্থা কেমন ছিলো, শহরের বর্ণাঢ্য, বৈচিত্রময় চরিত্র কারা; এমন কিছু অনুল্লেখযোগ্য কিন্তু তাৎপর্যময় ঘটনা নিয়ে তিনি প্রকাশ করেছেন উরসে চন্দন গন্ধ নামের এই বেশ বড়সড় গ্রন্থটি। এটি ফিকসন-ননফিকসন বা তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নয়। বরং তাঁর জীবনের সাথে জড়িত কিছু ঘটনা তিনি পাঠকদের জানাতে চেয়েছেন। এই জানাতে চাওয়াটাই হলো স্মৃতিকাতরতা। এই জানাতে চাওয়াটার নামই শহর সুনামগঞ্জ, তাঁর বন্ধুমহল ও পরিচিতজনদের প্রতি অনুরাগের বহিঃপ্রকাশ।
উরসে চন্দন গন্ধ বইটি প্রকাশের আগে ফোনে কয়েকবার তাঁর সাথে আমার কথা হয়েছে। আমি বইয়ের নামকরণ নিয়ে মৃদু আপত্তি তুলেছিলাম। বিশেষ করে ‘উরসে’ শব্দটির প্রতি ছিলো আমার আপত্তি। এই শব্দটি খুব প্রচলিত শব্দ নয়। আবার এটি খুব যে কাব্যিক একটি শব্দ তাও আমার মনে হয় নি। যদিও রবি ঠাকুরের কাব্যে উরস শব্দটির ব্যবহার পাওয়া যায়। ‘হৃদয় যমুনা’ কবিতায় তিনি লিখেছেন- ‘সোহাগতরঙ্গরাশি অঙ্গখানি নিবে গ্রাসি/ উচ্ছ্বসি পড়িবে আসি উরসে গলে’। আমাদের অঞ্চলে উরস বলতে সাধারণত মাজারকেন্দ্রিক উৎসবকে বুঝানো হয়। কিন্তু সংস্কৃতি ভাষা থেকে উদ্ভূত এই শব্দটির অর্থ বক্ষ বা বুক। সম্ভবত উরস শব্দটি ইমানুজ্জান মহীর খুব পছন্দ হয়ে গিয়েছিলো তাই রবি ঠাকুরের মতো তিনিও এই শব্দটিকে ভালোবেসে নিজের বইয়ের নামাকরণে যুক্ত করেছেন। অন্যের দ্বারা প্রভাবিত না হওয়ার এই নিজস্বতা তাঁকে বিশেষ উচ্চাসনে বসিয়েছে।
মানুষের জীবনের সবচাইতে আনন্দময় সময় হলো কর্ম ও সংসার জীবনের আগের সময়টুকু। বাল্য, শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের কিছু সময়; দূরন্ত এই সময়গুলোতে মানুষ যাবতীয় বন্ধনহীন অবস্থায় চারপাশের যাবতীয় আনন্দ নিজের মধ্যে ধারণ করার সুযোগ পায়। পরিবার ও অভিভাবকদের শাসন ও নজরদারি থাকে বটে কিন্তু এরপরও একান্ত স্বাধীনতার কিছু স্বাদ তখন গ্রহণ করা সম্ভব হয়। স্কুল-কলেজে অধ্যয়নকালীন সহপাঠী, পাড়া ও এলাকার সমবয়সীদের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে। সখ্যতা থেকে বন্ধুত্বের প্রগাঢ় বন্ধন। কোনোকিছু চাওয়ার নেই, পাওয়ার নেই। কেবলই প্রাণের সাথে প্রাণ মিলানো। ওই সময়টাকে মানুষ সারা জীবন ভুলতে পারে না। জীবনের এই হিরন্ময় সময়ের স্মৃতিসুখে মানুষ কাতর হয় পরবর্তী জীবনের ভার বহনের সময়। ইমানুজ্জামান মহী জীবীকার সন্ধানে বিদেশ গিয়েছেন। সেখানে নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে নিজেকে ও সন্তান-সন্ততিদের প্রতিষ্ঠা করেছেন। এখন তাঁর একান্ত অবসর। কিছুদিন আগে তিনি বিপত্নিক হয়েছেন। স্ত্রীকে অসম্ভব ভালোবাসতেন তিনি। বছরের পর বছর অসুস্থ স্ত্রীর সেবা-শুশ্রষা করেছেন পরম মমতায়। এখন তাঁর পাশে তিনি নেই। একান্তই একা। একাকিত্বের এই যন্ত্রণা থেকে তাঁকে মুক্তি দিতে আছে পেরিয়ে আসা ওই হিরন্ময় সময়ের স্মৃতিভাণ্ডার। এই স্মৃতিই তার বুকের চন্দন গন্ধ। নিতান্ত জাগতিক শৃঙ্খলের মধ্যে চন্দনের মতো সুরভি বিলিয়ে তাঁর জীবনকে সুরভিত করে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। তাঁর বুকে চন্দনের গন্ধের মতো সুরভী বিলানো ঘটনাপুঞ্জ দিয়েই তিনি রচনা করেছেন উরসে চন্দন গন্ধ।
উরসে চন্দন গন্ধে কী আছে, যা আমাদের জানা-বুঝার কাজে লাগবে ? হয়তো তেমন কিছু না, এগুলো না জানলে আমাদের জীবন চলার পথ থেমে যাবে না। আবার অন্য অর্থে অনেক কিছুৃ আছে। যা আমাদের নিজেকে উপলব্ধি করতে, অতীতে ফিরিয়ে নিতে অনন্য ভূমিকা রাখে। আমরা বুঝি, আরে আমরাও তো এরকম দূরন্ত বন্ধনহীন সময় কাটিয়ে এসেছি। আমাদেরও তো আছে এরকম কত শত স্মৃতি। তখন নিজে নিজেকে সেই সুন্দর সময়ে নিয়ে যেতে পারি। এটিই মহীর স্মৃতিকথা লিখা এবং আমাদের পাঠ করার সার্থকতা। ১৬৬টি আখ্যান আছে বইয়ে। ১৬৬ািট আখ্যানে ১৬৬ রকমের চরিত্র ও ঘটনা আমাদের পুরনো দিনে নিয়ে যায়। তাঁর বর্ণনায়িত অনেক চরিত্র আমাদের কাছে চেনা, আবার অনেক চরিত্রই একেবারে অচেনা। চেনা-অচেনা এই চরিত্রগুলো মিলে যে কোলাজ তৈরি হয় আমাদের মনে, মনে রাখতে হবে তাই সত্তর ও আশির দশকের সুনামগঞ্জ। এরকম দুষ্টুমিপনা, এমন বোহেমিয়াপনা, এমন উচ্ছ্বলতা, এমন ভালোবাসা, স্নেহ, এমন উদার ভাবগম্ভীর মানুষরাই এই শহরের ইতিহাস। শহর সুনামগঞ্জের ইতিহাস বলতে গেলে, নতুন প্রজন্মকে এই শহরের আদ্যোপান্ত জানাতে হলে এরকম স্মৃতিকথার গুরুত্ব অপরিসীম। ফিরোজাবু নামের অতি সাধারণ কিন্তু অতিশয় মমতাময়ী এক মাতৃস্বরূপা চরিত্রের কথা আমরা জানতে পারি তার স্মৃতিকাহিনী থেকে যে ফিরোজাবু তাঁকে একবার এক তস্করের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। কমল আপার কথা জেনেছি, লিপি নামের সতীশের সেই মেয়েটির কথা জেনেছি যাঁর কথা লেখক ফুলের গন্ধ মাখা হৃদয়ের অক্ষর দিয়ে বর্ণনা করেছেন, সেই লিপি এখন আর পৃথিবীতে নেই, লেখকের উপচে পড়া শোকও অপ্রকাশিত নয় এখানে। নরসুন্দর দয়ালদাকেও লেখক স্মৃতির ঝাঁপিতে সযত্নে রেখেছেন। আগে বাসায় এসে চুল কামানোর চল্ ছিলো, এখন উঠে গেছে। আমরা দয়ালদার কথা শুনে যতিদার কথা মনে করি, যে যতিদা চুল কামানোর সময় অনবরত রাজ্যের গল্প শোনাতেন, যতিদা ছিলেন রাজনীতি সচেতন, শ্রেণি সচেতনও বটে। তিনি সমাজ পরিবর্তনের অনেক কাজে নিজেকে জড়িত রেখেছিলেন। মহী ভাইর দয়ালদার বর্ণনা পৃথিবী থেকে চলে যাওয়া আমাদের পণ্ডিত খ্যাত যতিদার স্মৃতিকে সামনে নিয়ে আসে। আমাদের চরম বেদনাহত করে একাত্তরের যুদ্ধে সালমা বেগম নামের এক তরুণীর সম্ভ্রম হানির কথা জেনে, এই লজ্জা থেকে উৎসারিত ক্রোধ ও চেতনা এখনও এই জাতির অনুপ্রেরণার উৎস। কিন্তু প্রশ্ন জাগে মনে, তারপরেও স্বাধীনতার সুশীতল ছায়াতলে আমাদের প্রান্তিক মানুষের অবস্থান আজ কোথায় ? আমাদের প্রিয়জন কবি ইকবাল কাগজির প্রসঙ্গও আছে এই স্মৃতির থলিতে। তাঁরা উভয়ে বন্ধু। কিন্তু কবির পারিবারিক পদবি ‘কাগজি’ কে তিনি ভিন্ন এক কল্পনার রঙে সাজিয়েছেন যা একান্তই লেখকের নিজস্ব ভাবনা। আমাদের শহরের ধ্রুপদি রাজনীতিক অকাল প্রয়াত জাহিরুল ভাইর কথা আছে, বিনোদদার কথা আছে, প্রথিতযশা সাংবাদিক পীর হাবিবের কথা আছে, লেখক-বন্ধু শামীম লুতফারের দূরন্তপনার কথা আছে। সূচিতে এই শহরের আমাদের জানা সময়ের অপ্রতিরোধী প্রতিবাদী বীর মুক্তিযোদ্ধা মালেক পীর সম্পর্কে একটি আখ্যান আছে বলে দেখতে পাই। দুর্ভাগ্যবশতঃ আমার হাতে যে বইটি এসেছে তার ৩১৩ থেকে ৩৪৪ নম্বর পর্যন্ত পৃষ্ঠা না থাকার কারণে আমার ভালোবাসার মালেক ভাই সম্পর্কে লেখকের স্মৃতি জানা থেকে বঞ্চিত হয়েছি। এটি বইয়ের সম্পাদনাজনিত ত্রুটি যা না থাকলে পাঠক খুশি হন। বৈচিত্রময় চরিত্রের বাইরেও নানা বিষয়ে লেখকের নিজস্ব ভাবনা ও চিন্তাধারার প্রকাশ ঘটেছে অনেক লেখায়। লেখক যে সুন্দর বাংলাদেশ দেখার স্বপ্ন দেখতেন, নিজস্ব বিশ্লেষণে তার ব্যত্যয় দেখে তিনি পীড়িত হয়েছেন, কিছু লেখা থেকে এরকম ধারণা করা যায়। তিনি নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও দর্শনকে গোপন রাখেননি। নির্দ্ধাধায় তা জানিয়েছেন এবং আপন চিন্তা অনুসারে এক ধরনের উপসংহারে পৌঁছেছেন। জীবনবোধের গভীর দার্শনিক মূল্যায়নও পড়েছি কিছু লেখায়। মানুষ মাত্রই স্বকীয় চেতনায় উজ্জ্বল থাকতে ভালোবাসেন। ইমানুজ্জামান মহীও তেমন স্বাতন্ত্র্যবৈশিষ্ট্যসমৃদ্ধ এবং নিজ বিশ্বাসে অটল এক ব্যক্তি। তাঁর এই বিশেষ চরিত্র ঘরানাটিও ফুটে উঠেছে কিছু লেখায়।
এক বৈঠকে পুরো বইয়ের সকল কাহিনী নিয়ে লিখা সম্ভব নয়, তাই ওই জায়গা থেকে সরে আসতে চাই। শুধু বলি আঞ্চলিক ইতিহাসকে একত্রিত করলে যেরূপ জাতীয় ইতিহাসের পথরেখা তৈরি হয় তেমনি ইমানুজ্জামান মহীর উরসে চন্দন গন্ধ পাঠ করলে দুইটি দশকের সুনামগঞ্জ সম্পর্কে আমরা একটি পরিষ্কার ধারণা পেয়ে যাই। তাঁর লেখার শৈলী, শব্দচয়ন, বাক্যবিন্যাস, আবেগসমৃদ্ধ বর্ণনা প্রভৃতি মিলিয়ে বইটি এককথায় সুখপাঠ্য। অনেক বর্ণনায় তিনি কল্পনাশ্রয়ী ও আবেগমথিত অনুচ্ছেদ সৃজন করেছেন। অনবদ্য এই অনুচ্ছেদগুলো সাহিত্যমানে সরস বলেই মূল্যায়নযোগ্য। এই স্মৃতিনির্ভর গ্রন্থটি পাঠকমহলে সমাদৃত হোক।





















