০৮:৪৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আমির চলতো স্রোতের বিপরীতে

রিপোর্টার
  • সময় : ১১:১৯:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ মে ২০২৬
  • / ৫ ভিউ

ইশতিয়াক রুপু-আরেকজন সহপাঠী চলে গেলো না ফেরার দেশে। শহরের উত্তর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর অপর পাড়ে ছিলো নিজ বাড়ি। সেই নদীর নামের ইউনিয়ন পরিষদ সুরমা ইউনিয়নের জনপ্রিয় ও নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলো সদ্য প্রয়াত আমির হোসেন রেজা। চলতি মাসের ১৭ তারিখ রোববার গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিলো ঢাকার এক হাসপাতাল। সেখানে হয়ে গেলো জীবনকালের সমাপ্তি।

স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে সহপাঠী হিসাবে পেয়েছিলাম সরকারি জুবিলী বিদ্যালয়ে। সেই স্কুলে পড়াকালীন সময় থেকে রাজনীতির অঙ্গনে সংযোগ ছিলো। সেই সময়ের আওয়ামী লীগের মহকুমা শাখার সিনিয়র নেতা সহ ছাত্রলীগের বড় ভাইদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত জুনিয়র ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে আমিরের পরিচিতি ছিলো বেশ ভালো মাপের। ছাত্র রাজনীতিতে ব্যাপক সম্পৃক্ত থাকা আমিরের জীবনে ঘটে যায় এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। ’৭৩ সালে সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়া ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যে শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই হয়েছিল। ফলাফল গণনার সময় ঘটে এক অপ্রীতিকর ঘটনা। কলেজ কর্তৃপক্ষের ঘোষিত সংবাদে জানা যায়, ছাত্র ইউনিয়নের নেতাদের বিজয়ের খবর। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, সেই বিজয়ের সংবাদ না মেনে তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা সাব্বির ভাই ও আমির হোসেন মাইক নিয়ে শহরে বেরিয়ে আসে। ঘোষণা করতে থাকে কলেজের সংসদে ছাত্রলীগের বিজয়ী হওয়ার কথা।

রিকশায় বসা আমির হোসেন ও সাব্বির ভাই শহরের নতুন পাড়ায় এলে শহরের পশ্চিমাঞ্চলের ছাত্র ইউনিয়নের দুজন রাগী কর্মীর হাতে প্রহৃত হয়ে আহত হয় ছাত্রলীগের একনিষ্ঠ কর্মী আমির হোসেন। নিজ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সঙ্গে রাখা লোহার রডের আঘাতে আমির হোসেনের নাক ভেঙে গুরুতর আহতাবস্থায় প্রথমে সুনামগঞ্জ পরে সিলেট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছিল বেশ কিছুদিন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ বার বার নির্বাচিত চেয়ারম্যান আমির হোসেন সব সময় বীরদর্পে চলছে স্রোতের বিপরীতে। দলের সুসময়ে এমন ত্যাগী নেতাকে মোকাবেলা করতে হয়েছে ষড়যন্ত্রের। একমাত্র অপরাধ ছিলো আমির হোসেন ছিলো সকল ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে একজন সোচ্চার কর্মী। যা তৎকালীন দলের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সমর্থিত ছিল না। উনাদের লক্ষ্য ছিলো বিল বাদাল পাথর ও বালু খোয়াড়ি সহ মনোনয়ন বাণিজ্য নিয়ে মেতে থাকা। দলের আদর্শ বিক্রি করে যারা ব্যস্ত থাকতেন তাদের সঙ্গে সব সময় আমির হোসেনের স্পষ্টত বিরোধ ছিল।

আমির কখনো অন্যায়ের সঙ্গে আপোস করেনি। তাই বলে হয়তো সুরমার উত্তর পাড়ের একসময়ের বিশাল রঙ্গারচর ইউনিয়নকে ভেঙে তৈরি করা নতুন সুরমা ইউনিয়নের প্রথম চেয়ারম্যান আসনে নির্বাচিত করে এলাকার সাধারণ জনগণ। শহর সংলগ্ন এলাকায় বাসকরা আমির হোসেন রেজার পরিবার ছিলেন জেলার অনেক পুরানো ও সম্মানিত পরিবার। পরিবারের মুরুব্বিদের অনেকে ছিলেন জনপ্রিয় ও জনগণ সমর্থিত। এছাড়াও এলাকায় সব ধরনের শালিস বিচার আমিরদের বাড়িতে সম্পন্ন হয়েছে বিগত দিনে।

বন্ধুত্ব রক্ষা করা বা বন্ধুত্বকে সম্মান করতে আমিরের জুড়ি ছিলো না। নিজের সহপাঠীদের ভালো সময়ে যে রূপে স্মরণ করতো তেমনি যে কোন কারো খারাপ সময়ে ও খোঁজ খবর রাখতো। ১৯৭৩ ব্যাচের বেশিরভাগ সহপাঠীদের নিয়ে গঠিত গ্রুপের নেয়া সকল ধরনের মানবিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতো উৎসাহ নিয়ে।

শহরে কেন্দ্রস্থল উকিলপাড়ার মোড়ে তৈরী করে তিনতলা সুরম্য বাণিজ্যিক ভবন। নাম দেয় রেজা ম্যানসন। ভবনের নিচের তলায় স্থাপিত অফিসে এসে বসতো বিকালে। এলাকার জনগণ আসতো সামাজিক ও ভিন্ন ধরনের পারিবারিক সমস্যা নিয়ে। তা নিয়ে শহরের নানা জায়গায় দেন দরবার করতো। যাতে এলাকার মানুষজন সুবিধা ও সুবিচার পায়।

সদ্য প্রয়াত বন্ধু ও সহপাঠী আমির হোসেন রেজাকে নিয়ে স্মৃতিচারণের পরিধি এতো সহজে সংক্ষিপ্ত করা যাবে না। সারাজীবন রাজনীতিতে পুরোপুরি সক্রিয় থেকেও নিজ পরিবারের পাশে ছিলো বটবৃক্ষ হয়ে। ৬ জন মেয়ে সন্তানের পিতা হয়ে সব কয়টি মেয়েকে পাত্রস্থ করেছে সফল ভাবে। সম্ভবত ২০২৩ সালে জেলার সীমান্তবর্তী বর্ডার হাটে বেড়াতে গেলাম তিনটি মোটর সাইকেলে চড়ে। দুপুরের খাবার খেতে গিয়ে সবাই পুরো হতবাক। পুরো টেবিল পরিপূর্ণ নানা ধরনের মুখরোচক খাবারে। তার স্ত্রী ও দুই কন্যার বিনয়ী পরিবেশনার স্মৃতি সহজে ভুলার না।

পরিশেষে এটাই বলবো ক্রমে ক্রমে ছোট হয়ে আসছে বন্ধু আর সহপাঠীদের দলের আকার। যারা আছি তাদের উপর দায়িত্ব এসে পড়ছে স্মৃতি হয়ে যাওয়া সকল বন্ধুদের জন্য দোয়া করা আর স্মরণে রাখা। দোয়া করি বন্ধু আমির হোসেন রেজার জন্য তোমার সকল ভালো কর্মের পুরস্কার স্বরূপ আল্লাহ যেনো তোমাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আমির চলতো স্রোতের বিপরীতে

সময় : ১১:১৯:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ মে ২০২৬

ইশতিয়াক রুপু-আরেকজন সহপাঠী চলে গেলো না ফেরার দেশে। শহরের উত্তর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর অপর পাড়ে ছিলো নিজ বাড়ি। সেই নদীর নামের ইউনিয়ন পরিষদ সুরমা ইউনিয়নের জনপ্রিয় ও নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলো সদ্য প্রয়াত আমির হোসেন রেজা। চলতি মাসের ১৭ তারিখ রোববার গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিলো ঢাকার এক হাসপাতাল। সেখানে হয়ে গেলো জীবনকালের সমাপ্তি।

স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে সহপাঠী হিসাবে পেয়েছিলাম সরকারি জুবিলী বিদ্যালয়ে। সেই স্কুলে পড়াকালীন সময় থেকে রাজনীতির অঙ্গনে সংযোগ ছিলো। সেই সময়ের আওয়ামী লীগের মহকুমা শাখার সিনিয়র নেতা সহ ছাত্রলীগের বড় ভাইদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত জুনিয়র ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে আমিরের পরিচিতি ছিলো বেশ ভালো মাপের। ছাত্র রাজনীতিতে ব্যাপক সম্পৃক্ত থাকা আমিরের জীবনে ঘটে যায় এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। ’৭৩ সালে সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়া ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যে শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই হয়েছিল। ফলাফল গণনার সময় ঘটে এক অপ্রীতিকর ঘটনা। কলেজ কর্তৃপক্ষের ঘোষিত সংবাদে জানা যায়, ছাত্র ইউনিয়নের নেতাদের বিজয়ের খবর। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, সেই বিজয়ের সংবাদ না মেনে তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা সাব্বির ভাই ও আমির হোসেন মাইক নিয়ে শহরে বেরিয়ে আসে। ঘোষণা করতে থাকে কলেজের সংসদে ছাত্রলীগের বিজয়ী হওয়ার কথা।

রিকশায় বসা আমির হোসেন ও সাব্বির ভাই শহরের নতুন পাড়ায় এলে শহরের পশ্চিমাঞ্চলের ছাত্র ইউনিয়নের দুজন রাগী কর্মীর হাতে প্রহৃত হয়ে আহত হয় ছাত্রলীগের একনিষ্ঠ কর্মী আমির হোসেন। নিজ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সঙ্গে রাখা লোহার রডের আঘাতে আমির হোসেনের নাক ভেঙে গুরুতর আহতাবস্থায় প্রথমে সুনামগঞ্জ পরে সিলেট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছিল বেশ কিছুদিন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ বার বার নির্বাচিত চেয়ারম্যান আমির হোসেন সব সময় বীরদর্পে চলছে স্রোতের বিপরীতে। দলের সুসময়ে এমন ত্যাগী নেতাকে মোকাবেলা করতে হয়েছে ষড়যন্ত্রের। একমাত্র অপরাধ ছিলো আমির হোসেন ছিলো সকল ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে একজন সোচ্চার কর্মী। যা তৎকালীন দলের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সমর্থিত ছিল না। উনাদের লক্ষ্য ছিলো বিল বাদাল পাথর ও বালু খোয়াড়ি সহ মনোনয়ন বাণিজ্য নিয়ে মেতে থাকা। দলের আদর্শ বিক্রি করে যারা ব্যস্ত থাকতেন তাদের সঙ্গে সব সময় আমির হোসেনের স্পষ্টত বিরোধ ছিল।

আমির কখনো অন্যায়ের সঙ্গে আপোস করেনি। তাই বলে হয়তো সুরমার উত্তর পাড়ের একসময়ের বিশাল রঙ্গারচর ইউনিয়নকে ভেঙে তৈরি করা নতুন সুরমা ইউনিয়নের প্রথম চেয়ারম্যান আসনে নির্বাচিত করে এলাকার সাধারণ জনগণ। শহর সংলগ্ন এলাকায় বাসকরা আমির হোসেন রেজার পরিবার ছিলেন জেলার অনেক পুরানো ও সম্মানিত পরিবার। পরিবারের মুরুব্বিদের অনেকে ছিলেন জনপ্রিয় ও জনগণ সমর্থিত। এছাড়াও এলাকায় সব ধরনের শালিস বিচার আমিরদের বাড়িতে সম্পন্ন হয়েছে বিগত দিনে।

বন্ধুত্ব রক্ষা করা বা বন্ধুত্বকে সম্মান করতে আমিরের জুড়ি ছিলো না। নিজের সহপাঠীদের ভালো সময়ে যে রূপে স্মরণ করতো তেমনি যে কোন কারো খারাপ সময়ে ও খোঁজ খবর রাখতো। ১৯৭৩ ব্যাচের বেশিরভাগ সহপাঠীদের নিয়ে গঠিত গ্রুপের নেয়া সকল ধরনের মানবিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতো উৎসাহ নিয়ে।

শহরে কেন্দ্রস্থল উকিলপাড়ার মোড়ে তৈরী করে তিনতলা সুরম্য বাণিজ্যিক ভবন। নাম দেয় রেজা ম্যানসন। ভবনের নিচের তলায় স্থাপিত অফিসে এসে বসতো বিকালে। এলাকার জনগণ আসতো সামাজিক ও ভিন্ন ধরনের পারিবারিক সমস্যা নিয়ে। তা নিয়ে শহরের নানা জায়গায় দেন দরবার করতো। যাতে এলাকার মানুষজন সুবিধা ও সুবিচার পায়।

সদ্য প্রয়াত বন্ধু ও সহপাঠী আমির হোসেন রেজাকে নিয়ে স্মৃতিচারণের পরিধি এতো সহজে সংক্ষিপ্ত করা যাবে না। সারাজীবন রাজনীতিতে পুরোপুরি সক্রিয় থেকেও নিজ পরিবারের পাশে ছিলো বটবৃক্ষ হয়ে। ৬ জন মেয়ে সন্তানের পিতা হয়ে সব কয়টি মেয়েকে পাত্রস্থ করেছে সফল ভাবে। সম্ভবত ২০২৩ সালে জেলার সীমান্তবর্তী বর্ডার হাটে বেড়াতে গেলাম তিনটি মোটর সাইকেলে চড়ে। দুপুরের খাবার খেতে গিয়ে সবাই পুরো হতবাক। পুরো টেবিল পরিপূর্ণ নানা ধরনের মুখরোচক খাবারে। তার স্ত্রী ও দুই কন্যার বিনয়ী পরিবেশনার স্মৃতি সহজে ভুলার না।

পরিশেষে এটাই বলবো ক্রমে ক্রমে ছোট হয়ে আসছে বন্ধু আর সহপাঠীদের দলের আকার। যারা আছি তাদের উপর দায়িত্ব এসে পড়ছে স্মৃতি হয়ে যাওয়া সকল বন্ধুদের জন্য দোয়া করা আর স্মরণে রাখা। দোয়া করি বন্ধু আমির হোসেন রেজার জন্য তোমার সকল ভালো কর্মের পুরস্কার স্বরূপ আল্লাহ যেনো তোমাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।