যাদুকাটায় ড্রেজারের তাণ্ডব
- সময় : ০১:২১:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬
- / ৮ ভিউ
সাইদুর রহমান আসাদ-যাদুকাটা নদীর তীরবর্তী ঘাগটিয়া আদর্শ গ্রামে এখন আতঙ্কের নাম ‘কালা বাহিনী’। এই বাহিনীর প্রভাবে দীর্ঘদিন ধরে গ্রামজুড়ে বিরাজ করছে ভীতিকর ও থমথমে পরিবেশ। ভয়—ভীতি, চাপ এবং নানা কৌশলে গ্রামের মানুষকে বাড়িঘর বিক্রি করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এরপরই শুরু হয় ড্রেজারের তাণ্ডব। অল্প দামে কেনা বাড়িঘর এক রাতের ব্যবধানে ড্রেজার দিয়ে কেটে নদীগর্ভে মেশাানো হচ্ছে।
এভাবে ইতোমধ্যে অন্তত অর্ধশতাধিক বসতবাড়ি জাদুকাটা নদীতে বিলীন হয়েছে। গ্রামের অধিকাংশ পরিবার এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকেই নিজেদের শেষ সম্বলটুকু নামমাত্র দামে বিক্রি করেছেন। যেসব বাড়িঘর এখনো টিকে আছে, সেগুলোর মালিকরাও চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। যে কোন সময় রাতের আঁধারে ড্রেজারের তাণ্ডবে বিলীন হবে বাড়িঘর, এমন আশঙ্কা প্রতিনিয়ত তাড়া করে তাদেরকে।
৩৫ বছর আগে (১৯৯১—৯২ সালে) আশ্রয়হীন ও ভূমিহীন মানুষের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে জাদুকাটা নদীর তীরে সরকারি খাসজমিতে আদর্শ গ্রাম বা গুচ্ছ গ্রাম গড়ে তোলে সরকার। অসহায় পরিবারগুলোর জন্য নির্মাণ করা হয় ঘরবাড়ি। মরুভূমির ন্যায় ধূ ধূ বালুচরে বসতি গড়ে তোলার ব্যবস্থা হলেও নদীতীরের উর্বর জমিতে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন ওখানকার বাসিন্দারা।
তবে কয়েক বছর ধরে বালুমহাল কেন্দ্রিক ব্যবসা এবং অতিরিক্ত মুনাফার প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে। ইজারাদারদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি প্রভাবশালী চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠে কথিত ‘কালা বাহিনী’। ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগ করে বাসিন্দাদের কাছ থেকে বাড়িঘর ও জমির দখল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর রাতের আঁধারে ড্রেজার দিয়ে নদীতীর কেটে নেওয়ায় নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতি।
সরেজমিনে ঘাগটিয়া আদর্শ গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পুরো গ্রামজুড়ে বিরাজ করছে এক ধরনের থমথমে পরিবেশ। কথা বলতে চাইলে অধিকাংশ বাসিন্দাই মুখ খুলতে রাজি হন নি। অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কথিত ‘কালা বাহিনী’র বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তাকে মারধরের শিকার হতে হয়। অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার মেলে না। বরং অভিযোগের পর নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। এমনকি বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে হয়রানি ও কারাভোগের ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন তারা।
এমন পরিস্থিতির বর্ণনা দেন গ্রামের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব মো. আকাশ মিয়া। তিনি বলেন, ১৯৯১—৯২ সালে বিএনপি সরকারের সময় আশ্রয়হীন মানুষ হিসেবে আমরা এখানে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছিলাম। এই গ্রাম রক্ষার জন্য অনেক প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু কোনো লাভ হয় নি। উল্টো মারধরের শিকার হয়েছি। তিনি আরও বলেন, ১৫ দিন আগে আমার বসতভিটা ড্রেজার দিয়ে কেটে নদীতে নিয়ে গেছে কালা বাহিনী। আমি প্রতিবাদ করেছিলাম। এরপর আমাকে মারধর করা হয়। আমার স্ত্রী—সন্তানকে কিছু টাকা দেওয়া হয়েছে। অসহায় হয়ে তারা ওই টাকায় ঘর বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। এখন আমার কোনো ঘর নেই। যেখানে আমার বসতঘর ছিল, সেখানে এখন নদী।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে আকাশ মিয়া বলেন, আমার ছেলেকেও বাড়িতে গিয়ে মারধর করা হয়েছে। বিষয়টি থানায় জানিয়েছিলাম। এরপর আমাদের উপরই উল্টো চাপ আসে। আমাদের নামে মামলা হয়েছে। জেলও খেটেছি। জেল থেকে বের হবার পরও প্রকাশ্যে আমাকে মারধর করেছে কালা বাহিনীর লোকজন।
তিনি দাবি করেন, শুধু তার পরিবার নয়, গ্রামের আরও অনেক মানুষের ঘরবাড়ি একইভাবে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। অনেকেই তিন থেকে চার লাখ টাকায় বসতভিটা বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। সবাই বুঝে গেছে, অভিযোগ করে কোনো লাভ নেই। প্রশাসনও চলে এই বাহিনীর ঈশারায়। তারা (প্রশাসন) আমাদের রক্ষা করতে পারবে না। আকাশ মিয়ার অভিযোগ, ‘কালা বাহিনী’র নেতৃত্বে রয়েছেন রানু মেম্বার। তার ভাষ্য, রানু মেম্বারের সঙ্গে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তাহিরপুর ও সুনামগঞ্জের অনেক বড় নেতার সঙ্গে তার চলাফেরা।
আকাশ মিয়ার স্ত্রী রাজেনা বেগম বলেন, নদী থেকে বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙন ধীরে ধীরে বসতঘরের কাছাকাছি চলে আসে। তখন অনেকেই বাধ্য হয়ে নিজেদের ঘরবাড়ি বিক্রি করে দেন। একজনের বসতভিটা বিক্রির পর সেখানে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হলে পাশের বাড়িটিও নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ে। এভাবে একের পর এক বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হতে থাকায় শেষ পর্যন্ত সবাই বাধ্য হয়ে বসতভিটা বিক্রি করেছি।
তিনি বলেন, আশপাশের প্রায় সব বাড়ি বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর নদীভাঙনে আমার ঘরের এক পাশ ভেঙে যায়। তখন আর কোনো উপায় ছিল না। বাধ্য হয়ে রানু মেম্বারের কাছে চার লাখ টাকায় আমাদের বসতভিটা বিক্রি করেছি। রাজেনা বেগমের দাবি, এ ধরনের জমি বা বসতভিটার ক্রেতা শুধু রানু মেম্বার নন। আরও কয়েকজন রয়েছেন। তাদের বাড়ি বাদাঘাট, তাহিরপুর ও সুনামগঞ্জ শহরের বিভিন্ন এলাকায়।
গ্রামের বাসিন্দা জুয়েল বলেন, আমার আশপাশের প্রায় সব বসতভিটা তাহিরপুরের কয়েকজনের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। এখন তারা ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করলে পাশের জমিগুলোও নদীভাঙনের মুখে পড়বে। তাই শেষ পর্যন্ত আমিও বাধ্য হয়ে আমার বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছি।
তিনি বলেন, অনেকেই দূর থেকে আমাকে দোষ দেয়। কিন্তু আমার আর কী করার ছিলো? চারপাশের সবাই যখন একে একে জায়গা বিক্রি করে দিলো, তখন আমার সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। আমিও বাধ্য হয়ে ভিটেমাটি বিক্রি করেছি। এখন সেখানে ড্রেজার চলছে, বালু তোলা হবে। চোখের সামনে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কিছুই করতে পারলাম না।
জুয়েলের মতো বুকফাটা কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছেন ঘাগটিয়া আদর্শ গ্রামের আরও অনেক বাসিন্দা। চোখের সামনে একের পর এক বসতঘর ড্রেজারে কেটে নদীগর্ভে বিলীন হতে দেখেও প্রতিবাদ করার সাহস হারিয়ে ফেলেছেন তারা। ভয়, অনিশ্চয়তা আর অসহায়ত্ব যেন স্তব্ধ করে দিয়েছে তাদের কণ্ঠ। শেষ পর্যন্ত ভিটেমাটি রক্ষা করতে না পেরে নামমাত্র টাকার বিনিময়ে বসতভিটা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। চোখের জল মুছে, দীর্ঘদিনের স্মৃতি আর শেকড় ফেলে একে একে গ্রাম ছাড়ছেন তারা।
গ্রামের বাসিন্দা মো. গোলাম কিবরিয়া বলেন, ১২ লাখ টাকার জায়গা বাধ্য হয়ে তিন থেকে চার লাখ টাকায় বিক্রি করছেন গ্রামবাসি। এছাড়া কোনো উপায় নেই। এ ধরণের জোরজুলুম ও অন্যায়ের প্রতিবাদে সম্প্রতি মানববন্ধন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। রাতে কালা বাহিনীর সদস্যরা আমাদের হুমকি দিয়েছে, মানববন্ধন করলে মারধর করবে। পরে ভয়ে সমাবেশ—মানববন্ধন করা হয় নি। তিনি বলেন, ড্রেজার বা সেইভ মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে প্রতি রাতে কোটি টাকার বালু নিচ্ছে। গ্রামের মসজিদ ও গোরস্তান নদী গর্ভে চলে যাচ্ছে।
কালা বাহিনী যেভাবে গড়ে ওঠে
গ্রামবাসিদের ভাষ্য, এই কালা বাহিনীর প্রধানদের অন্যতম রানু মেম্বার। তার পুরো নাম মোশাহিদ হোসেন রানু। তিনি বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের ছয় নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য। পর্যায়ক্রমে বিগত সময়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন ও রনজিত চন্দ্র সরকারের ঘনিষ্টজন হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। তৎকালীন আওয়ামী সরকারের আমলে যাদুকাটা নদীর পাড় কাটতে প্রকাশ্যে নেতৃত্ব দিতেন রানু মেম্বার। ২৪’ এর গণঅভ্যুত্থান ও ত্রয়োদশ নির্বাচনের পরেও তার প্রভাব আগের মতোই আছে। সময় গড়ানোর সাথে সাথে আরও অনেক ‘রানু মেম্বার’ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়ভাবে এরা বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা হিসেবেই পরিচিত। সবাই মিলে ইজারাধীন যাদুকাটা নদীতে অবৈধভাবে নদীর পাড় কেটে বালু লুটের রাজত্ব কায়েম করছে তারা।
অভিযুক্ত বাদাঘাট ইউপি সদস্য মোশাহিদ হোসেন রানু বললেন, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করলে ইজারাদারের লোকজন বলে আমরা প্রতিবাদ করার কে? অবস্থা এমন হয়েছে, বাড়ি আমার কাছে বিক্রয় না করলেও এটি নদীগর্ভেই যাবে। এজন্য বাধ্য হয়ে সকলে বিক্রয় করছে।
তিনি আরও বলেন, শুধু আমি না, আরও অনেকের কাছে গ্রামের মানুষ বাড়ি জমি বিক্রয় করছে। আমার মতো প্রভাবশালী আরও অনেকে আছে। তারাও জায়গা কিনেছে। কেউ তাহিরপুরের, কেউ বাদাঘাটের, কেউ সুনামগঞ্জ শহরের। তবে কেউ জোর জুলুম বা জবদস্তিমূলকভাবে বাড়ি—জমি কিনেনি। স্বেচ্ছায় জায়গার মালিক বিক্রি করেছে। আমরা কিনে নিচ্ছি।
ঘাগটিয়ার বাঁশঝাড়ও নেই
ঘাগটিয়া আদর্শ গ্রামের উত্তর—পশ্চিম দিকে যাদুকাটা নদীর তীরঘেঁষা প্রায় ১১ বিঘা জমিজুড়ে একসময় ছিল বিশাল একটি বাঁশঝাড়। এই বাঁশঝাড়ের জমির মালিক ছিলেন গ্রামের মোশাহিদ হোসেন তালুকদার। প্রায় এক বছর আগে তিনি পুরো বাঁশঝাড়টি কয়েকজন ক্রেতার কাছে বিক্রি করে দেন। মোশাহিদ তালুকদার বলেন, বাঁশঝাড়টি আর রক্ষা করতে পারব না বুঝেই নিরুপায় হয়ে এক বছর আগে বিক্রি করেছি। জমি কেনার সঙ্গে একাধিক ব্যক্তি জড়িত ছিলেন। তবে কেনাবেচার প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করেছেন দুই থেকে তিনজন। জমির ক্রেতাদের পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি তিনি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একসময় যেখানে ঘন বাঁশঝাড় ছিল, সেখানে এখন আর বাঁশের কোনো অস্তিত্ব নেই। পুরো এলাকা ফাঁকা হয়ে গেছে। নদীর কিনারায় নির্মাণ করা হয়েছে পলিথিন ঘেরা একটি ছোট কুঁড়েঘর, যা বর্তমানে ওই জায়গার একমাত্র দৃশ্যমান স্থাপনা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাসিন্দা জানান, বাঁশঝাড়টি কেনার পর দিনই সেখানে রাতের আঁধারে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ইতোমধ্যে ওই স্থান থেকে বালু উত্তোলনও শুরু হয়েছে। এ কারণেই পুরো বাঁশঝাড়ের বাঁশ কেটে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, সুযোগ পেলেই ড্রেজার চালিয়ে বাঁশঝাড়ের ১১ বিঘা জমিই কেটে নেওয়া হবে। এলাকাবাসী হয়তো দুই এক মাসের মধ্যেই আঙ্গুল দিয়ে নদী দেখিয়ে বলবে, ‘এইখানে ছিল এক বাঁশ বাগান।’ একপর্যায়ে পুরো গ্রাম ভাঙনের শিকার হবে।
শুধু ঘাগটিয়া আর্দশ গ্রামেই নয়, জাদুকাটা নদীর তীরবর্তী আরও কয়েকটি গ্রাম একই সংকটের মুখে আছে। লাউড়েরগর গ্রামের উত্তরপাড়া, ডালারপাড়, রাজারগাঁও, বিন্নাকুলি, জালরটেক, গরকাটি, ঘাগড়া, মানিগাঁও, আদর্শগ্রাম এবং নোয়াপাড়া আদর্শগ্রাম বালুখেকোদের তাণ্ডবে নদীতে বিলীন হবার আতঙ্কে পড়েছে। নদীর তীর কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ভাঙনের তীব্রতা। এতে বসতভিটা, ফসলি জমি ও জনবসতি হারানোর পাশাপাশি পুরো এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছে মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, যাদুকাটা নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলো ধীরে ধীরে নদীতে বিলীন করছে বালুখেকোরা। পাড়কাটার কারণে সাধারণ মানুষ তাদের বসতভিটা হারাচ্ছেন। অনেকেই ভয় ও চাপের মুখে জমি—ঘর ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার যারা প্রতিবাদ করতে চান, তাদের বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে যাদুকাটা নদীর তীরবর্তী এলাকাকে দ্রুত পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে বালুমহালকে ইজারা পদ্ধতির পরিবর্তে স্থানীয় বারকি শ্রমিকদের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের ব্যবস্থা করা উচিত। কারণ স্থানীয় শ্রমিকরা তাদের গ্রাম ও নদীতীর রক্ষা করেই বালু উত্তোলন করতে পারবেন। এক্ষেত্রে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের জীবন—জীবিকা রক্ষায় সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
হুমকিতে দেশের বৃহৎ শিমুল বাগান
অবৈধ বালু উত্তোলনের হুমকিতে পড়েছে লাল ফুলের অপার সৌন্দর্যমণ্ডিত দেশের বৃহৎ শিমুল বাগান। রাতের আঁধারে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে বাগানের সামনের একপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা ইতোমধ্যে কেটে নেওয়া হয়েছে। বাগানের সামনে সামান্য কিছু জায়গা রেখে বাকি অংশ থেকে বালু উত্তোলন করায় পুরো শিমুল বাগান এখন নদীভাঙন ও ভূমিধসের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে যে কোনো সময় এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম আকর্ষণও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাগানের এমন পরিস্থিতি দেখে পর্যটকেরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরশাদ হাসান বললেন, আমরা বন্ধুরা মিলে ঘুরতে এসেছি। গতবছরেও এসেছি। শিমুল বাগানের সামনে অনেক পরিবর্তন দেখে আমি হতাশ হয়েছি। এভাবে চলতে থাকলে দেশের সবচেয়ে বড় শিমুল বাগান হয়তো আর দেখতে পারবো না। যেভাবে বালু উত্তোলন করে নেওয়া হয়েছে, এভাবে চললে এটি বিলীন হয়ে যাবে। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আবেদন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ ও যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
৫ হাজার কোটি টাকার সরকারি সম্পদ লুটের দাবি
যাদুকাটার পাড় কাটা বা এর পাশের পরিবেশ বিনষ্ট করায় কী পরিমাণ রাষ্ট্রিয় সম্পদের ক্ষতি হয়েছে এর কোন হিসাব সরকারি বা বেসরকারি দায়িত্বশীল কোন সংস্থার কাছে নেই। তবে ২০২৪’র পাঁচ আগস্টের পর ওই বছরের ২১ আগস্টে বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার সত্রিশ গ্রামের খুরশেদ আলম নামের এক ব্যক্তি দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে করা আবেদনে দাবি করেছিলেন, ২০২২ সাল থেকে যাদুকাটা—১ ও যাদুকাটা—২ বালুমহাল সৃজন করে ইজারা প্রদানে রাজস্ব কমতি নেওয়া, জমি পানির দামে কেনা—বেচা, চাঁদাবাজিসহ নানাভাবে সরকার ও জনগণের প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা লুট করেছে বালুখেকো সিণ্ডিকেট। এই লুটপাটে বিভিন্ন সময়ে অসৎ সরকারি কর্মকর্তা—কর্মচারীদেরও যোগসাজস ছিল।
ইজারাদারের বক্তব্য
যাদুকাটা বালুমহাল—১ ও ২ এর সর্বশেষ ইজারা হয় বাংলা ১৪৩২ সালে অর্থাৎ ২০২৫ ইংরেজির ১৪ এপ্রিল। রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১০৭ কোটি টাকা। এরপর আর ইজারা হয় নি। ১৪৩৩ বাংলা সনে ইজারা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলে আগের বছরের ইজারাদাররা উচ্চ আদালতে মামলা করেন। পরে আদালতের আদেশে ইজারা বিজ্ঞপ্তির কার্যক্রম পাঁচ মাসের জন্য স্থগিত হয়ে যায়। বালু মহাল—২ এর ইজারাদার শাহ রুবেলের কছে নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, আমরা নদীর নির্ধারিত অংশ থেকেই বালু উত্তোলন করি। নদীর তীর কাটা বন্ধে গেল দুই মাসে জেলা প্রশাসকের কাছে ১০টি আবেদন করেছি।
তিনি বলেন, শিমুল বাগান এবং নদীতীরবর্তী গ্রামগুলো রক্ষায় সেখানে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের দাবি জানিয়েছি। পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে নদীর তীর রক্ষার দায়িত্ব তাদের ওপর দেয়ার প্রস্তাবও করেছি।
শাহ রুবেল আরও বলেন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ—পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) আমাদেরকে ড্রেজারের মাধ্যমে নির্ধারিত স্থান থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছে। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করেই ইজারা সীমানার মধ্যে বালু উত্তোলন করছি। একই মন্তব্য করেন এবং বালুমহাল—১ এর ইজারাদার নাছির মিয়া।
প্রশাসন যা বলছে
পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বলেন, বালুমহালের ইজারাদারদের জন্য সরকার নির্ধারিত কিছু শর্ত দিয়েছে। এসব শর্ত লঙ্ঘিত হলে ইজারা বাতিল কিংবা জামানত বাজেয়াপ্ত করার সুযোগ আছে। ইজারাদারকে নিজস্ব জনবল দিয়ে নির্ধারিত এলাকায় সনাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তিনি নিজে বালু উত্তোলন না করে বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছ থেকে টোল আদায় করছেন এবং বিস্তীর্ণ এলাকায় তাদের বালু উত্তোলনের সুযোগ দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, এসব ব্যক্তি বালু উত্তোলনের সময় অনেক ক্ষেত্রে নদীর তীর কাটছেন, আবার ইজারা সীমানার বাইরেও বালু তুলছেন। শর্ত অনুযায়ী সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বালু উত্তোলনের অনুমতি থাকলেও বাস্তবে রাতেই অধিকাংশ বালু উত্তোলন হচ্ছে। পুলিশ সুপার আরও বলেন, ইজারাদারকে নিয়ন্ত্রণে আনার দায়িত্ব মূলত যেসব কর্তৃপক্ষ ইজারা দিয়েছেন— তাদের। তারা কার্যকর ব্যবস্থা নিলে সমস্যার ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এছাড়া নদীর দুই তীরে অসংখ্য ড্রেজার, সেইভ মেশিন এবং বিপুল পরিমাণ মজুত বালু রয়েছে। এসবের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া গেলে এমন পরিস্থিতি শৃঙ্খলায় ফিরে আসবে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বললেন, বালুমহালের ইজারাদাররা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারছেন না। আমরা তাদের স্পষ্টভাবে জানিয়েছি, ইজারা নেওয়ার পরও যদি আশপাশে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলতে থাকে, তাহলে সেটি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও তাদের রয়েছে। জেলা প্রশাসক আরও বললেন, ইজারাদাররাও উচ্চ আদালতে একটি মামলা করে রেখেছে, ওই মামলাকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে তারা। আমরা কিছু বলতেও পারছি না, চিঠিও দিতে পারছি না এজন্য। তবে সলিসিটার উইংয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া আছে।
তিনি বলেন, এলাকাটি অত্যন্ত দুর্গম ও দূরবর্তী। সেখানে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি না থাকলে অবৈধ বালু উত্তোলন, ড্রেজার মেশিনের ব্যবহার এবং নদীর তীর কাটা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা কঠিন। আমাদের নির্বাহী ম্যাজিস্টে্রটরা বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনের আওতায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে পারেন। আমরা নির্দেশনা দিয়েছি, কাউকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত অবস্থায় পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী অন্তত ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে।
তিনি আরও বলেন, ওই এলাকায় একটি স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত টাস্কফোর্স অভিযান পরিচালনার জন্যও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে আরও কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
কোস্ট গার্ড নিয়োগের দাবি এমপির
সুনামগঞ্জ— ১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল গেল মাসের ২৫ তারিখ শিমুল বাগান, নদী তীরবর্তী গ্রাম রক্ষায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন করেছেন। তিনি আবেদনে উল্লেখ করেছেন, এশিয়ার বৃহৎ শিমুল বাগান, যাদুকাটা নদীর উপর নির্মানাধীন সেতুসহ নদী তীরবর্তী অর্ধশতাধিক গ্রাম হুমকির মুখে। এসব রক্ষায় নদীতে নিয়মিত নৌ পুলিশের স্পেশাল টিম কিংবা প্রয়োজনে কোস্ট গার্ড নিয়োগেরও দাবি জানিয়েছেন তিনি। – দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর


















