সাহসী ও সুবক্তা ছিলেন আবেদীন ভাই
- সময় : ০৮:৪৭:০০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১ মে ২০২৬
- / ২ ভিউ
স্বপন কুমার দেব
সুনামগঞ্জ শহরের ও গ্রামের মানুষদের শোক সাগরে ভাসিয়ে জন মানুষের নেতা দেওয়ান শামসুল আবেদীন ভাই ২৬ শে এপ্রিল ২০২৬ সাল তারিখে অনুমান ৮২ বৎসর বয়সে রাত ১১ ঘটিকায় মৃত্যুবরণ করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। আট ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন তিনি। ইতোপূর্বে ভাইদের মধ্যে পঞ্চম ভাই সুনামগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান কবি দেওয়ান মমিনুল মউজদীন ২০০৭ সালে নভেম্বর মাসে সিডরের দিনে হৃদয়বিদারক কার এক্সিডেন্টে স্ত্রী, এক পুত্র ও গাড়িচালকসহ নিহত হলে সর্বত্র শোকের মাতম উঠেছিল। যা দীর্ঘদিন চলতে থাকে। আবেদীন ভাই ১৯৭৯ সালে বিএনপি’র টিকেটে সুনামগঞ্জ ০৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য বা এমপি নির্বাচিত হন। সুনামগঞ্জে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের তিনি অন্যতম একজন প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। দল বদলে বিএনপি তে আর ফেরা না হলেও আবেদীন ভাই ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের টিকেটে সুনামগঞ্জ ৪ আসন থেকে পার্লামেন্ট মেম্বার হতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এছাড়া একবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবেও কনটেস্ট করেন। তবে নির্বাচনে পরাজিত হলেও কখনও তিনি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। সুনামগঞ্জ সদর এবং বিশ্বাম্ভরের মানুষের সঙ্গে উনার ঘনিষ্ঠ ও নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ এবং মেলামেশা অব্যাহত থাকে। সুখে—দুঃখে সবসময় পাশে থাকতে দেখা গেছে।
দেওয়ান শামসুল আবেদীন মরমী কবি হাছন রাজার প্রপৌত্র। তাদের মরহুম পিতা দেওয়ান আনোয়ার রাজা চৌধুরী ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে ন্যাশন্যাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) থেকে কুড়েঘর প্রতীকে ন্যাশন্যাল এসেম্বলীর মেম্বার পদের জন্য ইলেকশনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুদিন পর আনোয়ার রাজা চৌধুরী সাহেব ইন্তেকাল করেন। সুনামগঞ্জ গভঃ জুবিলী হাইস্কুল জীবনে আবেদীন ভাই আমার দুই বৎসরের সিনিয়র ছিলেন। তখন নাইন টেন কক্ষ স্কুলের র্ফাষ্ট ব্লকে। আমরা পেছনে কাঠের ব্লকে। উঁচু ক্লাসের ছাত্রদের সঙ্গে বিশেষ সমীহভাব বজায় রাখা হতো। কথাবার্তাই হতো না প্রায়। উনারা পিঠাপিঠি অনেক ভাই হওয়ায় আমাদের সময়ে আবেদীন ভাই থেকে শুরু করে কোন না কোন ভাই অনেকের ক্লাসমেট ও বন্ধু ছিলেন। সেই হিসাবে আমার সহপাঠী বন্ধু তৃতীয় ভাই দেওয়ান শফিকুস সাবেরিন। আবেদীন ভাই স্কুল জীবনে ভালো স্পোর্টসম্যান ছিলেন। তিনি ভলিবল খেলতেন। শটপুট, ডিসকাস জভেলিন থ্রো করতেন। তবে সাবেরিন জভেলিন থ্রোতে দক্ষ ও পারদর্শী অধিক। তাদের বসত বাড়ি সাহেব বাড়ি বা সাব বাড়ি নামে পরিচিত হলেও চলনে বলনে সেই ভাব ছিল না। তাছাড়া স্কুলের ইউনিফর্ম সবার এক। সাদা পাজামা ও সাদা হাফ শার্ট। খালি পা। শুরু থেকেই আবেদীন ভাইয়ের বন্ধু মহল ছিল বিশাল। স্কুল জীবনে উনার বন্ধু হিসেবে যাদেরকে দেখেছি — আহাদ চৌধুরী (আহাদ ভাই), হুমায়ুন মঞ্জুর চৌধুরী (সিনিয়র এডভোকেট হুমায়ুন ভাই), সুরেশ দাস (প্রয়াত এডভোকেট সুরেশ দাস), প্রয়াত সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার ভাই, অমিতাভ চৌধুরী (পিনুদা), আশেপাশের গ্রামের একজন যিনি পরবর্তী জীবনে ইঞ্জিনিয়ার হয়েছিলেন তিনি (নাম এই মুহুর্তে মনে আসছেনা) সহ অনেকজন।
১৯৬৪ সালে এস এস সি পাশ করে তৎকালীন সুনামগঞ্জ বেসরকারী কলেজে ভর্তি হয়ে আবেদীন ভাইকে সিনিয়র স্টুডেন্ট হিসাবে পাই। উল্লেখ করা যায় যে, তখন কয়েক বছর আগে ট্রাফিক পয়েন্ট থেকে পুরান কলেজ ভবন নুতন জায়গাতে স্থানান্তরিত হয়েছিল। ভূমি দান করেছিলেন দেওয়ান আনোয়ার রাজা চৌধুরী। সেই সময়ে ছাত্র ইউনিয়ন সংগঠন কলেজে খুব শক্তিশালী ছিল। আবেদীন ভাই, মৌলাবক্স করিমবক্স পরিবারের সাদিক ভাই প্রমুখেরা সুনামগঞ্জে ছাত্রলীগ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। কলেজে আবেদীন ভাইকে সর্বদা প্রাণবন্ত উচ্ছল অবস্থায় দেখতাম। চমৎকার ফিগারের অধিকারী আবেদীন ভাই সকল শিক্ষার্থীদের কাছেই আকর্ষণীয় ছিলেন। পোষাক পরিচ্ছদে সৌখিন ও দৃষ্টিনন্দন। কলেজে উনার বন্ধু সার্কেলের পরিধি বাড়ে। নুতন একজনের মনে আছে। টুবলু। আবেদীন ভাই ও বন্ধুদের ট্রাফিক পয়েন্ট এলাকাতে ‘ডাইরি’ নামের চা মিষ্টির দোকানে প্রায়ই দেখা যেত আড্ডায়। ডাইরিতে দুইটি কেবিন ছিল। তখনকার সময় শীতকালে পাখি শিকার অনেকের কাছে নেশার মতো ছিল। আবেদীন ভাই বন্ধুদের সাথে নিয়ে বিল বাদাড়ে পাখি শিকারে যেতেন ও বন্দুক দিয়ে পাখি শিকার করতেন। তিনি বে—হিসাবি ধরনের খরচিয়া মানুষ ছিলেন। অঢেল পরিমাণে টাকা পয়সা খরচ করতেন। এই স্বভাব উনার আজীবন ছিল। ফলশ্রুতিতে উনাকে একসময় ভুগতে হয়েছে। কলেজ জীবন পর্যন্ত আবেদীন ভাইয়ের সঙ্গে আমার কোন কথাবার্তা হয়নি বলেই মনে পড়ছে।
আবেদীন ভাই যখন পুরো রাজনীতিবিদ তখন আমি উকিল হয়ে বারে যোগ দেই। তারপর থেকে ক্রমশ কথাবার্তা শুরু হয়। তিনি খুবই রাজনীতি সচেতন ছিলেন এবং এ বিষয়ে উনার যথেষ্ট পড়াশোনা ছিল। তাদের বাড়িতে প্রচুর বই ছিল। সুনামগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠাকালে উনাদের পারিবারিক লাইব্রেরীর সমস্ত বই পাবলিক লাইব্রেরিতে দান করে দেয়া হয়েছিল। তিনি রেডক্রিসেন্ট এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তখন রেডক্রিসেন্ট সেক্রেটারি ছিলেন সম্ভবত দবির ভাই (সৈয়দ দবির আহমদ)। দবির ভাই জাকেরিন ভাইয়ের বন্ধু হলেও আবেদীন ভাইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব হয়। তেমনি সিনিয়র অ্যাডভোকেট হোসেন তওফিক ভাইয়ের সাথে ঘনিষ্ঠতা হয়। উনার আরো দুজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন সাচনা চধরী বাড়ির রন্জু ঘোষ চৌধুরী ও তাহিরপুর থেকে আগত এইচ এম পি শিক্ষক মন্মথ বাবু। আবেদীন ভাইয়ের আমন্ত্রণে মন্মথ বাবু অনেকদিন তাদের বাড়িতেই পরিবারের সদস্যের মতো করে বসবাস করেন। এম পি হওয়ার আগে পরে অনেক বন্ধু ছিলেন। নবীন প্রবীণ অনেক বন্ধু।
সিনিয়র সাংবাদিক সাফি ভাইয়ের সঙ্গে উনার গভীর বন্ধুত্ব ছিল। পাগলার মন্নান উকিল সাহেবের সাথেও বন্ধুত্ব ছিল। সিনিয়র জুনিয়র সবার সঙ্গে মিশে যেতে সহজাত গুণের অধিকারী ছিলেন আবেদীন ভাই। তিনি দীর্ঘদিন লবজান স্কুলের কর্ণধার ছিলেন। একসময়ে আইনজীবী হিসাবে অনেক দেওয়ানী মামলার যোগসূত্র ধরে আবেদীন ভাইয়ের সঙ্গে আমার যোগাযোগ বেড়েছিল যথেষ্ট। জাকেরিন ভাইয়ের বেশিরভাগ বন্ধুরা উনারও বন্ধু হন। যেমন — অজুদা, বিজনদা, মিন্টুদা, আব্দুন নূর, মইনুল ইসলাম, মিনু ভাই প্রমুখ। তাছাড়া নতুন পাড়ার সমীর দেবরায়, ব্যাংকার নৃপেশ তালুকদার নানু বাবু, নীহারেন্দু দেব নান্টু, মতিলাল ধর উনাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল। কদ্দুস মিয়া ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। আগে পরে নবীন প্রবীণ অনেক বন্ধু। এমপি হওয়ার আগে আবেদীন ভাইয়ের রাজনৈতিক জীবনে আরেকটি টার্নিং পয়েন্ট এসেছিল।
দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরী যেবার পৌরসভা ইলেকশনে পরাজিত হয়েছিলেন সেই ইলেকশনে বিরাট অংশ মানুষের চয়েস ছিল দুইজন। আবেদীন ভাই কিংবা ইকবাল ভাই। আবেদীন ভাই কোন এক কারণে নিজে থেকেই সরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হয়তো বি এন পি ত্যাগ করাও ঠিক হয়নি। আরেকটি ভিন্ন কাহিনী— বাংলাদেশ আমলেই অনেক আগে তাদের ওয়াকফ এস্টেটভুক্ত ঝাওয়ার হাওরে বাম্পার মাছের ফলন হয়েছিল। ফিসিংকালে বিশাল সাইজের রউ (রুই) মাছে খলা ভর্তি হয়ে পাহাড় জমেছিল। আবেদীন ভাই শহরে অনেকের মাঝেই মাছ বিতরণ করেন। অতি নিকটে মনে হলেও তখন ঝাওয়ার হাওরে যাওয়ার পথ ছিল দুর্গম, তবে যারা ফিসিং ও মাছ দেখতে গিয়েছিলেন তারা উপহার হিসাবে বড় রউ মাছ নিয়ে ফিরতেন। আবেদীন ভাই শহরের মানুষের কাছে একজন আপনজন ও প্রিয়জন ছিলেন। তিনি সাহসী ও সুবক্তা ছিলেন। বড় আধিকারিক কিংবা মন্ত্রী যিনিই হোন না কেন তিনি স্পষ্ট কথা বলে দিতেন। দু’তিন বৎসর আগে উনাদের আম্মা মারা গেছেন। এবারে বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের অধিকারী শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মানুষ আবেদীন ভাই বিদায় নিলেন। সুনামগঞ্জবাসী উনাকে মনে রাখবেন নিঃসন্দেহে। আবেদীন ভাইয়ের স্ত্রী পুত্র কন্যা ভাই—বোন পরিবার পরিজনের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানাই। মহান সৃষ্টিকর্তা আবেদীন ভাইকে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান দান করুন।









