রোকেস লেইসের ভ্রমণ-আখ্যান-চলতি পথে যেটুক দেখা
- সময় : ০৩:১৫:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬
- / ১৬ ভিউ
কুমার সৌরভ-রোকেস লেইস মূলত এবং প্রধানত কবি। তিনি সুনামগঞ্জের কাব্যভূবনে আপন মহিমায় উদ্ভাসিত এক নাম। নিজস্ব এক কাব্যভাষা তৈরির নিরন্তর প্রয়াস তাঁর। এই কাব্যভাষা কতোটা সফল তা বিচারের ভার পাঠকের। তবে আমার মতো এক নাদান পাঠক তার কাব্যবিষয়প্রকরণ ও ব্যবহার-সফল ভাষার এক ক্ষুদ্র অনুরক্ত। তিনি যখন গদ্য লিখলেন তখন আমার আগ্রহ আরও বেড়ে গেলো। কবি যখন গদ্য লিখেন তখন সেটি একসময় কবিতাই হয়ে যায়। কবির হাতের ছোঁয়া পেয়ে শব্দ, বাক্য, পঙক্তি, অনুচ্ছেদ; পুরো বই তখন কবিতার পেখম মেলে, মেঘমল্লারের আহ্বানে ময়ুর যেমন পেখম মেলে চারপাশের পরিবেশ সুন্দর করে দেয় তেমন। কবি ভ্রমণপ্রিয় মানুষ। সুযোগ পেলেই ছুটেন এখানে-ওখানে, সীমানা পেরিয়ে ভিন্ সীমানায়। এরকম করেই ভারতের প্রকৃতি কন্যা দার্জির্লিং ভ্রমণ করেন তিনি। সে সুবাদে দেখা হয় বাংলাদেশ লাগুয়া উত্তর-পূর্ব ভারতের কুচবিহার, হলদিবাড়ি, জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, গৌহাটি, শিলং, চেরাপুঞ্জি প্রভৃতি। অনেকেই গেছেন এসব জায়গায়। কিন্তু সকলে কবি-মন নিয়ে যাননি। তাই রোকেস লেইসের দেখা ও এক সাধারণ পর্যটকের দেখার মধ্যে ফারাক থেকে যায়ই। বর্ণনাগুণে যেকোনো ভ্রমণ কাহিনী অসাধারণ সাহিত্য হয়ে উঠে। বাংলা সাহিত্য তথা বিশ্বসাহিত্য ভ্রমণ সাহিত্য স্বতন্ত্র একটি ধারা হয়ে সমুজ্জ্বল আছে। আমরা সকলেই জীবনে অসংখ্যবার এখানে-সেখানে যাই, দেশের ভিতরে বা বাইরে। জীবনের দায়ে যাই, নিছক বেড়ানোর জন্যও যাই। নতুন জায়গার নতুন নতুন শোভা দর্শনে আমরা বিমোহিত হই। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে আত্মহারা হই। অচেনা মানুষের চেহারার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে ভাবি- আহারে পৃথিবী কতো বৈচিত্রময়। একজন সাহিত্য-মনা পরিব্রাজক বাইরে যেয়ে এই জিনিসগুলোই দেখেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের সাথে তাঁর পার্থক্য এই, তিনি সবকিছু কেবল চর্মচক্ষু দিয়ে দেখেন না বরং অন্তর্চক্ষু দিয়ে এর ভিতরে প্রবেশ করেন। পরিব্রাজক যখন তাঁর দেশ দর্শনকে ভাষ্যলিপিতে পাঠকের নিকট হাজির করেন তখন তা হয়ে উঠে ভ্রমণ-সাহিত্য। অন্নদাশঙ্কর রায় বলেছিলেন, পরিব্র্রাজককে কোথাও যাওয়ার আগে শত রকমের প্রস্তুতি নিয়ে যেতে হয়। রোকেস লেইসের চলতি পথে যেটুক দেখা ভ্রমণ-আখ্যানটি পড়ে আমার মনে হয়েছে, তিনি একটি ভ্রমণ পরিকল্পনা তৈরি করেই পথে বের হয়েছিলেন। ভ্রমণ সাহিত্যের আরেক বৈশিষ্ট্য হলো একে নিছক ভ্রমণ বিবরণীর বাইরে নিয়ে যেয়ে পাঠকের মনে পাঠের স্পৃহা ও পাঠসুখ জাগিয়ে তোলা, যাতে পাঠক বইয়ের পাতায় চোখ রেখে ওই স্থানকে জীবন্ত মনে করতে পারেন। এজন্য কেবল দেখলেই হয় না, দ্রষ্টব্য স্থানের ঐতিহাসিক, সামাজিক ইতিহাস সম্পর্কেও ধারণা থাকতে হয়, খোঁজতে হয়। ভ্রমণ সাহিত্যিক দেশ বর্ণনার সাথে নিজের উপলব্ধিটুকুও জানিয়ে দেন, তা হতে পারে বর্তমানের সাথে ভবিষ্যৎ এর সম্পর্ক কেমন হবে তার পূর্বানুমান। রাশিয়ার চিঠি ভ্রমণ-সাহিত্যে রবি ঠাকুর সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ব্যবস্থায় যেমন মোহিত হয়েছিলেন, এই ব্যবস্থাকে লোক হিতকর মনে করেছিলেন তেমনি এর ‘ছাঁচে ফেলা’ শিক্ষা ব্যবস্থারও সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করতেন শিক্ষা ব্যবস্থার নির্দিষ্ট ছাঁচ ব্যক্তির সৃজনশীলতা বিকাশের জন্য সহায়ক নয়।
একইসাথে রবীন্দ্রনাথ বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্রের কারণে মানবকল্যাণকর এই ব্যবস্থাটি আবার না কখন ধসে পড়ে, এ নিয়েও চিন্তিত ছিলেন। কী অদ্ভুত, রবীন্দ্রনাথের উদ্বেগ রাশিয়ার চিঠি প্রকাশের ৫ দশক পর বাস্তব হয়ে উঠে, পরিবর্তনটা শুরু হয়েছিলো আগেই ভিতর থেকে সাম্রাজ্যবাদী প্ররোচনায়। নব্বই দশকে পুরো সোভিয়েত ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে। পরিব্রাজক যদি এমন তীক্ষ পর্যবেক্ষণী ক্ষমতার অধিকারী শব্দ-কারিগর হন, তখন তা যেমন ঐতিহাসিক দলিল হয়ে উঠে তেমনি হয় সুখপাঠ্য।
আগেই বলেছি রোকেস লেইস প্রকৃতিগতভাবে কবি মনের অধিকারী। তিনি যা দেখেন তার বর্ণনা কাব্যিক ব্যঞ্জনায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠে। ভ্রমণের দ্রষ্টব্য স্থানের যে অনুপুঙ্খ নিবিড় বিবরণ তিনি দিয়েছেন তাতে তাঁর নিবিষ্টতার পরিচয় মিলে। কিছুই উপেক্ষিত থাকে নি তাঁর অবলোকন থেকে। প্রকৃতি ও নিসর্গের চমৎকার ধারাবিবরণী গ্রন্থটিকে ভ্রমণ-সাহিত্যের মর্যাদার আসনে বসিয়েছে বলে আমি মনে করি। শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিংয়ের জিপে উঠেই চলতি পথে যেটুক দেখার যে বর্ণনা দিয়েছেন তা মূলত তাঁর কবিসত্ত্বারই বহিঃপ্রকাশ। দার্জিলিংগামী পথকে তিনি বর্ণনায়িত করছেন এভাবে‘‘সামনে মায়াবী নীল পাহাড়ের সারি চোখ বেয়ে মনজুড়ে ছড়িয়ে দিতে থাকবে নৈসর্গিক ভালোলাগা, যা একান্তই উপলব্ধির, অনুভবের। কখনো গভীর নীল পাহাড়ের নিচ বা ওপর থেকে উড়ে চলা ধবল মেঘদল ঢেকে দিচ্ছে দৃষ্টি, আবার কখনো মেঘের পর্দা সরে গিয়ে সতেজ, সজীব সবুজ নিমগ্নতায় হারিয়ে যাওয়া, সিক্ত ঘাস-পাতা একরাশ পেলব প্রশান্তি।’’ (পৃষ্ঠা-১১)। আমরা যারা ভ্রমণ করি তারা গাড়িতে উঠেই দু’চোখ বন্ধ করে দেই ঘুম, ফলে প্রকৃতি থাকে অদেখা। কিন্তু কবি চলতি পথের সবটুকু রূপ নিংড়ে নিংড়ে তা থেকে মধু আহরণ করে সকলের পাতে পরিবেশন করতে সদা তৎপর থাকেন। টাইগার হিলে উঠে সূর্যোদয় দেখতে দেখতে কবির মনে হলো ‘‘পূর্বাকাশে অদ্ভুত স্বর্ণালী রক্তিম রং ছড়িয়ে বহু দূরের পাহাড়ের পেছন থেকে উঁকি দিয়ে একটু একটু করে বেরিয়ে আসতে থাকলো প্রতিদিনকার চিরচেনা সূর্য, ভিন্ন মাত্রা ভিন্ন আঙ্গিকে।’’ (পৃষ্ঠা১৮)। সূর্য চিরপুরনো হলেও এর মাহাত্ম্য চিরনবীন। প্রতিদিন সূর্য নিজের আলো ছড়িয়ে আমাদের মানুষের সভ্যতাকে টিকিয়ে রেখেছে। এই সূর্য প্রতিক্ষণেই নতুন নতুন উৎপাদনশীল রূপে প্রতিভাত হয় আমাদের কাছে, যেমনটি কবিও ভাবছেন। নৈসর্গিক দৃশ্যের এমন কাব্যমধুময় বর্ণনা বইয়ের সর্বত্রই উজ্জ্বল।
বইয়ের বর্ণনায় আমরা পাই, দার্জিলিং ভ্রমণকালে লেখকের সাথে বাংলাদেশে অধ্যয়নরত এক নেপালী তরুণীর পরিচয় হয়। সেই তরুণী যখন বলছিল‘পড়া শেষ হলে কাজ পেলে বাংলাদেশে থেকে যাব’ তখন বাংলাদেশ নিয়ে আমাদের গর্ব হয়। ভারতের লাইনপ্রথা লেখককে খুব মোহিত করেছে। তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন সেখানে কোনো ঠেলাঠেলি নেই, হুড়োহুড়ি নেই, সকলেই লাইনে দাঁড়িয়ে সময়মতো নিজের কাজটুকু সেরে ফেলছেন। লাইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সামনে বাড়ার কোনো প্রবণতা নেই কারো মাঝে। লেখকের কথায়‘‘ওই একটি বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। যে আগে আসবে সে আগে যাবে।
কিন্তু লাইনকে পাশ কাটিয়ে নয়। যে যত বড় রথী মহারথীই হোন না কেন, লাইন মানতেই হবে, কোনো বিকল্প নেই।’’ (পৃষ্ঠা-২২)। ওখানকার ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ে লেখক বলছেন, রাস্তায় লাইন ভাঙার কোনো প্রবণতা গাড়িচালকদের মধ্যে নেই, অযথা হর্ন বাজনোর বদভ্যাস নেই, ফলে সড়কে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় না। এইসব বর্ণনা পড়ে আমরা ভাবি, আহা! আমাদের দেশটাও যদি এমন লাইনপ্রথা ও শৃঙ্খলার মধ্যে চলে আসত।
কোচবিহারের হলদিবাড়ি ও হেমকুমারী গ্রাম ভ্রমণপর্বে আমরা লেখকের আবেগমথিত অবস্থা লক্ষ্য করি। এই হেমকুমারী গ্রামেই লেখকের মায়ের জন্ম ও বাল্যকাল কেটেছে। আট দশক আগে সে গ্রামে জন্মেছিলেন লেখকের আম্মা। আবেগতাড়িত লেখক মায়ের জন্মভিটায় প্রবেশ করে মায়ের স্মৃতি হাতড়ান। পরিবর্তন ঘটে গেছে বহু। কিন্তু সেই মাটিতে তিনি নিজের মতো করে খোঁজে নিয়েছেন মায়ের স্মৃতি। মায়ের বাল্যসই সুধাবুজানের সাথে দেখার সেই দৃশ্য বর্ণনা পাঠ করে পাঠকের চোখ ছলছল করে। এভাবেই কবি হলদিবাড়িতে তার মাতৃকূলের যত সংযোগ আছে তার সবই অবলোকন করার চেষ্টা করেন। একে বলে নাড়ির টান। এই নাড়ির টানে কোনো বিষয়গত লাভ-ক্ষতির হিসাব না করেই মানুষ ছুটে যায় শিঁকড়ের কাছে। এই শিকড়ের টানেই লেখক হলদিবাড়িতে অবস্থিত তাঁর নানার বাসাটি দেখতে গিয়েছিলেন। জায়গাটি এখন হাত বদল হতে হতে অনেক দূরের ব্যক্তিদের দখলে। যাদের কাছে লেখকের আবেগের কোনো মূল্য নেই। দেখা হলো না নানাবাড়ি। নানাবাড়ি দেখা না হলেও মা’র জন্মভিটে দেখার তৃপ্তি পেয়েছেন লেখক। হেমকুমারির যে বাড়িতে তাঁর মা জন্মেছিলেন, প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছিলেন; সেই বাড়ির বর্তমান অধিবাসীরা তাঁর সাথে চমৎকার ব্যবহার করেছেন। দেশভাগে বিক্ষত দুইটি পরিবারের মধ্যে ওই সাক্ষাৎপর্ব যেনো ছিলো দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর প্রত্যাশিত মিলনের অপার আনন্দে ভরপুর। হেমকুমারীতে কবি দেখেছেন সম্প্রীতির উজ্জ্বল উদ্ভাসন। হেমকুমারীর নানাবাড়ি- যেখানে তাঁর মার জন্ম, সেই বাড়ির বর্তমান মালিকরা তাঁকে বেশ সমাদর করেছেন।
ওখানে গ্রামের অনেকেই এসেছিলেন, তিনি তাঁদের সাথে মিশেছেন, যেনো সকলেই তাঁর মামাতো ভাই-বোন। কবির বর্ণনায় এই সাক্ষাৎ ছিলো এরকম- ‘খবর পেয়ে দু’একজন আসলেন, আলাপ হলো পুরনো দিনের, আত্মীয়তার, বন্ধনের বিচ্ছেদের।… ক্ষিতিশ দেবসিংহ, রমণীমোহন দেবসিংহ, হামিদুল মাস্টার, আবুল কাশেম সরকার সবাই অতিসাধারণ। ধুতি, লুঙ্গি, খালি গা, কারো কাঁধে আবার গামছা ঝুলানো, গ্রামের সহজ-সারল্যে নির্ভার মুখচ্ছবি, গ্রামের সবুজতায় নম্র নিষ্কললুষ।… এরা সবাই মানবিক মমত্বে যুথবদ্ধ, পরষ্পর আবদ্ধ, ঋদ্ধ।… এদের ধর্মবিশ্বাস নিজস্ব পরিমণ্ডলে আচার পালনে নিবিষ্ট। পারষ্পরিক সম্পর্ক সম্প্রীতিতে মানবধর্ম চর্চায় এরা স্বতঃস্ফূর্ত. অভ্যস্ত’। এই বর্ণনায় দেশভাগে বিক্ষত দুইটি পৃথক রাষ্ট্রের মানুষের মনের ভিতরকার বেদনার্ত ঐকতান ফুটে উঠে। দেশভাগ উভয় অঞ্চলের অনেককেই উন্মূল করে ঠেলে দিয়েছে অচেনা-অজানা ঠিকানায়। ইতোমধ্যে কয়েক প্রজন্ম গত হলেও দেশভাগের সেই বেদনাবোধ আজও বয়ে চলেছে এর শিকার মানুষগুলো। মামার বাড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন লেখকও তাঁদের একজন। তাই তিনি হেমকুমারী, হলদিবাড়িকে এই বাংলার সাথে মিলিয়ে দেখে বলছেন, ‘রাস্তার দু’পাশে ফসলের ক্ষেত সবুজ ঝিরঝির হাওয়া সবই চিরচেনা একই আকাশ একই বাতাস। কিন্তু কাঁটাতারের ওপাড়ে বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি আর এপাড়ে মায়ের জন্মভূমি কেমন যেন অস্বাভাবিক, অগ্রহণীয়।’ লেখকের কাছে দেশ ভাগ অস্বাভাবিক, অগ্রহণীয় হলেও, রাজনীতি ও ক্ষমতার মোহগ্রস্ত তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবর্গের মনে তা তখন সামান্য অনুরণন তৈরি করতে পারে নি। এই রাজনৈতিক কপট সিদ্ধান্ত আমাদের একই দেহকে দুই ভাগে বিভক্ত করার অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। স্মৃতি যতোদিন আছে, সম্পর্ক যতদিন মানুষের মনকে প্রভাবিত রাখবে ততদিন এই মানসিক যন্ত্রণা আমাদের বয়ে বেড়াতে হবে।
ভ্রমণকালে পরিলক্ষিত রাষ্ট্রিক আর্থ-সামাজিক অসঙ্গতিগুলোও লেখকের দৃষ্টি এড়ায় নি। মেঘালয়ের পর্বতমালা দেখতে এসে তিনি লক্ষ্য করলেন, একটি পরিবেশবাদী সংগঠনের মামলার কারণে কয়লা আহরণ বন্ধ আছে। এতে যে বিশাল একটি শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে তা সুস্থ্য পরিবেশের জন্য কতটুকু সহায়ক তাও মুদ্রার আরেক পিঠ। পরিবেশের দোহাই দিয়ে শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থান হরণের পুঁজিবাদী কপটতার পরিচয় মিলে এই ঘটনায়। পরিবেশের অপরিহার্য অংশ মানুষ। কিন্তু ভ্রান্ত কাঠামোগত রাষ্ট্রীয় দর্শনে তথাকথিত পরিবেশ রক্ষার জন্য যে পরিমাণ গুরুত্ব দেয়া হয়, মানুষকে ততোটাই উপেক্ষা করা হয়। পর্যটন স্থানগুলোকে বাণিজ্যিক উপকরণে পরিণত করার বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে উঠে মেঘালয়ের এলিফ্যান্ট ফলস দেখার সময় ক্যামেরা বা ক্যামেরাযুক্ত ফোন ব্যবহারের জন্য পৃথক টিকেট কাটার তথ্য জেনে। প্রকৃতির সৌন্দর্যমণ্ডিত উদারতার সাথে বেনিয়াবৃত্তির বিষয়টি মানানসই না হলেও আজ অবলীলায় পর্যটনকে মুনাফামুখী বাণিজ্যে পরিণত করা হয়েছে, যেমন ভারতে তেমন বাংলাদেশসহ সর্বত্র। বাংলাদেশের অন্যতম সমস্যা তিস্তা নদীর ন্যায্য পানির হিস্যা পাওয়া। লেখক ওই তিস্তা নদী পার হচ্ছিলেন, তখন বর্ষা মওসুম হলেও লেখকের ভাষায় নদীটি ছিলো ‘পানিহীন’। গজলডোবায় ব্যারেজ তৈরি করে তিস্তার পানি-প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার কারণে শিলিগুড়ি শহর নিকটবর্তী ক্যানেলকে পানিতে টইটম্বুর দেখতে পান লেখক। কবির বর্ণনায়- ‘এর আশপাশের ভূমি সতেজ ফসলময়, যা জলপাইগুড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত’। অথচ এই আন্তর্জাতিক নদীর বাংলাদেশ অংশ তীরবর্তী অঞ্চলে চলছে মরুকরণ প্রক্রিয়া।
আন্তর্জাতিক নদীর পানি বণ্টনের আইনি বাধ্য-বাধকতা না মানার কারণে আমরা চরম বিপর্যয়ে। এর সমাধান কীভাবে হবে তাও অনিশ্চিত। শিলং ভ্রমণকালে বিশ^কবির স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলোর তথ্যবহুল বর্ণনা পাঠককে মুগ্ধ করবে। মেঘালয়ের উমিয়াম লেক নিয়ে প্রচলিত মিথের বর্ণনাও আমাদের জানার পরিধিকে সমৃদ্ধ করে। খাসি ভাষায় উমিয়াম শব্দটির বাংলা অর্থ কান্নার জল। স্বর্গ থেকে নেমে আসা দুই বোনের একজনের চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার কারণে অন্য বোনের কাতর অশ্রুপাত থেকে এই নামের উৎপত্তি। এই কাহিনী জেনে আমরাও হারিয়ে যাওয়া স্বর্গকন্যার জন্য বিষাদগ্রস্ত হই।
বিদেশে থাকলে দেশকে অনুভব করা যায় হৃদয়মথিত আবেগ দিয়ে। বিদেশ বিভুঁইয়ে দেশের পরিচিত কাউকে পেলে সেই টান হয়ে উঠে অলঙ্ঘনীয়। শিলিগুড়িতে সাময়িক অবস্থানরত সুনামগঞ্জের অ্যাডভোকেট মানিক লাল দে’র আতিথেয়তা, তপন ভ্রাতৃদ্বয়, শিলংয়ের পম্পা প্রমুখের আন্তরিক অতিথি বরণ থেকে তা লেখক আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন। এটিকে মূলের প্রতি মানুষের অন্তহীন অনুরাগ বলা যেতে পারে। এই টান অচ্ছেদ্য, যুক্তিহীন; কেবলই মনের আবেগ দ্বারা রচিত। মানুষের এমন সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ববোধ, সম্প্রীতি সব কালে সব মানুষের সবচাইতে অনিবার্য চাহিদা। কিন্তু নিজস্ব বলয়ে আসলেই তা আমরা ভুলে যাই। পরষ্পর পরষ্পরকে দূরে ঠেলে দেই। এমন বৈপরিত্য থেকে মানবসমাজ যেদিন বেরিয়ে আসতে পারবে, সেদিনই পৃথিবী হবে আনন্দ-আলয়। বইয়ের অন্য সবিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো বেড়ানোর জায়গাগুলোর ছবি পরিবেশন। এটি বইয়ের বৈচিত্র বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে।
সুন্দর প্রচ্ছদ, মুদ্রণ পারিপাট্যও প্রশংসনীয়। ইচ্ছা করেই এই বইয়ের কোনো নেতিবাচক সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকলাম। কেননা কোনো সৃষ্টিকর্মই সম্ভবত শতভাগ পরিশুদ্ধ হতে পারে না। বিবেচনা করতে হবে কর্মের উদ্দেশ্য দিয়ে। লেখক তাঁর ভ্রমণ বর্ণনার দ্বারা যে কাব্যমধুমাখা পরিবেশ পাঠকদের উপহার দিয়েছেন, সে দিকেই মনোযোগ নিবদ্ধ রাখা উচিৎকর্ম বলে মনে করি। বইটি পাঠকনন্দিত হোক।





















