তসলিমা নাসরিন-

তাজমহল বিশাল এক প্রেমের সৌধ। সম্রাট শাহজাহান বানিয়েছেন স্ত্রী মমতাজ মহলকে ভালোবেসে। যদি ভালোই বাসতেন তিনি, অনেকের প্রশ্ন, তাহলে মমতাজ মহলের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হবে জেনেও কেন বিয়ে করেছিলেন অন্য কাউকে, কেন মমতাজ মহলকে বিয়ে করার পরও বিয়ে করার লোভ সামলাতে পারেননি, কেন মমতাজের মৃত্যুর পরও উপপত্নী রাখলেন? যদি ভালোই বাসতেন, ১৯ বছরে ১৪টি সন্তান জন্ম দিতে মমতাজকে বাধ্য করেছিলেন কেন, ১৪তম সন্তান জন্ম দিতে গিয়েই তো মমতাজের মৃত্যু হলো। যদি মমতাজকে তিনি ভালোই বাসতেন, এত উপপত্নী বা রক্ষিতাই তিনি কী করে রাখতেন! এসবের উত্তর যাই হোক না কেন, আমি মনে করি, ভালো না বাসলে তাজমহলের মতো সৌধ গড়ে তোলা যায় না। তাঁর সব ত্রুটি নিয়েই তিনি মমতাজকে ভালোবাসতেন। মমতাজ ছাড়া আর কোনও পত্নী বা উপপত্নীর জন্য তিনি সৌধ গড়েননি। এই তাজমহল পৃথিবীর অন্যতম এক আশ্চর্য। এই তাজমহল ভারতের গৌরব। ভারত সম্পর্কে কিছু না জানলেও মানুষ তাজমহল সম্পর্কে জানেন। লক্ষ লক্ষ দেশি-বিদেশি মানুষ প্রতিবছর এই তাজমহল দেখতে আসেন। আর এই তাজমহলের নামই কিনা উত্তর প্রদেশের নতুন পর্যটন প্রচার পুস্তিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

তাজমহল তৈরি হয়েছে মুসলিম আমলে, সুতরাং হিন্দুত্ববাদীদের বক্তব্য, এই তাজমহল ভারতের গৌরব হতে পারে না। কারণ মোগল সম্রাটেরা হিন্দুদের নির্যাতন করেছে, হিন্দুদের হাজার হাজার মন্দির ভেঙে দিয়েছে। তাই তাজমহলের নাম বাদ দিয়ে পর্যটন পুস্তিকায় দেওয়া হয়েছে গোরক্ষপুর মঠের নাম। হিন্দুদের মঠ মন্দিরের নাম থাকবে পর্যটন পুস্তিকায়, মুসলমানদের সৌধ বা মসজিদের নাম থাকবে না, কারণ মুসলমানেরা হিন্দুদের নির্যাতন করেছে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই বহিরাগত মুসলিমরা হিন্দুদের নির্যাতন করেছে। নির্যাতন তো ইংরেজরাও করেছে। কিন্তু যারা সম্রাট আকবরকে ঘৃণা করে, তারা কিন্তু লর্ড ক্লাইভের বিরুদ্ধে কিছু বলে না, যারা জাহাঙ্গীরকে ঘৃণা করছে, তারা হেস্টিংসের ব্যাপারে একেবারেই চুপ। এর মানে কি এই নয় যে অত্যাচারী ইংরেজকে যতটা অপছন্দ, অত্যাচারী মুসলিমকে তারও চেয়ে বেশি অপছন্দ!
হিন্দু মুসলমানের ঘৃণার ফলে ভারত ভাগ হয়েছে। এই ঘৃণার ফলে দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। পাকিস্তানে হিন্দুরা নির্যাতিত হচ্ছে। হিন্দু মেয়েদের অপহরণ করে জোর জবরদস্তি ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে।   হিন্দুরা ভয়ে দেশ ছাড়ছে। বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের কট্টর মুসলমান যেমন ঘৃণা করে হিন্দুকে, ভারতের কট্টর হিন্দুও তেমন ঘৃণা করে মুসলমানকে। ভারতবর্ষে কট্টর হিন্দুরা আগে এত ক্ষমতা পায়নি, তাই তাদের ঘৃণার প্রকাশও খুব একটা দেখতে পাইনি। এইবার দেখছি গো-রক্ষকদের তাণ্ডব, গোমাংস খাওয়ার অভিযোগ তুলে মুসলমানদের খুন করা, হিন্দু মৌলবাদ, হিন্দুর কুসংস্কার ইত্যাদির নিন্দে করেছেন বলে কয়েকজন মুক্তচিন্তকের খুন হয়ে যাওয়া।

ভারতের কংগ্রেস আর সিপিএম নেতারা বলেছেন, ‘পর্যটন পুস্তিকায় তাজমহলের নাম না থাকাটা একপ্রকার তামাশা, আর বাজেট তহবিল থেকে তাজমহল বাদ পড়ার ঘটনা দুঃখজনক। এই ঘটনা পুরোপুরি ধর্মীয় পক্ষপাতদুষ্ট। ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন উত্তরপ্রদেশ রাজ্য সরকার। তাজমহলের সঙ্গে জাতপাত, সম্প্রদায়ের কোনও যোগ নেই। এ দেশে হিন্দু-মুসলিম একসঙ্গে বাস করে। এভাবে তাজমহলের নাম বাদ দেওয়া থেকে বিজেপি সরকারের উদ্দেশ্য বোঝা যায়। রাম দিয়ে শাহজাহানকে ঢাকতে চাইছে বিজেপি। তাই শাহজাহানের প্রেমের সৌধ তাজমহল এখন মেরুকরণের রাজনীতির মধ্যমণি। ’

উত্তরপ্রদেশ সরকার আগ্রার চেয়ে অযোধ্যা নিয়ে ভাবছেন বেশি। অযোধ্যায় রামরাজ্য বানানো হবে। মুখ্যমন্ত্রী বলে দিয়েছেন “ভারতীয় সংস্কৃতির অনুকূল নয় তাজমহল। ” উত্তরপ্রদেশের বিজেপি বিধায়ক সংগীত সোম তো আরো ভয়ঙ্কর কথা বলে দিয়েছেন। বলেছেন তাজমহল ভারতীয় সংস্কৃতিতে কলঙ্ক চিহ্ন। এই কলঙ্ককে সমূলে উৎপাটন করা উচিত। শাহজাহান হিন্দুদের খতম করতে চেয়েছিলেন, সুতরাং তাজমহলের ইতিহাসই বদলে ফেলা দরকার। আরেক নেতা বিনয় কাটিয়া বলেছেন, শিবের মন্দির ভেঙে বানানো হয়েছে তাজমহল, এই মন্দিরের নাম ছিল তেজোমহল। মুসলমান নেতারা বসে নেই। সমাজবাদী পার্টির আজম খান বলেছেন, “শুধু তাজমহল কেন, গুঁড়িয়ে ফেলা হোক সংসদ ভবন, রাষ্ট্রপতি ভবন, লালকেল্লাও। সেগুলোও বহন করছে গোলামির ইতিহাস। সেগুলোও দাসত্বের প্রতীক। ”

মেরুকরণের এই রাজনীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, তিনি আগ্রায় তাজমহল দেখতে যাবেন। তাজমহলের জন্য অর্থ বরাদ্দও করবেন। তবে জানিয়ে দিয়েছেন একটি কারণেই তিনি তাজমহলকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, তা হলো, তাজমহল ভারতের শ্রমিকদের পরিশ্রমের ফসল। মুখ্যমন্ত্রী গুরুত্ব দিতে চান অযোধ্যাকে। সরযূ নদীর তীরে প্রায় ১০০ মিটার উঁচু রামের মূর্তি স্থাপনের তোড়জোড় করছেন। ভবিষ্যতে রাম-মাহাত্ম্য এমন প্রচার করা হবে যে অযোধ্যার গুরুত্ব তাজমহলের চেয়ে বেড়ে যাবে। বিজেপির অনেকে বলছেন, এই মুহূর্তে গোটা দুনিয়ায় তাজমহলই পর্যটনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। তাই রাতারাতি তাজমহলকে উপেক্ষা করাও সম্ভব নয়। কিন্তু ভারতের হিন্দু সংস্কৃতির ধারক হিসেবে অযোধ্যাকেই ভবিষ্যতে গড়ে তোলা হবে সবচেয়ে বড় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে।

হিন্দুত্ববাদীরা মনে করছেন, বাবরি মসজিদের মতো করে তাজমহলের নিষ্পত্তি যদি সহজ না হয়, তবে বরং হিন্দু মন্দির হিসেবে তাজমহলকে অধিকার করা জরুরি। ভারতের একটি মুসলিম স্থাপত্য নিয়ে পৃথিবীর এত উচ্ছ্বাস দেখতে তারা রাজি নন। তাজমহলকে ভারতের সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে তাঁরা কিছুতেই মানবেন না। তাজমহলকে ধর্মান্তরিত হয়ে হিন্দু হতে হবে, তাহলেই এই স্থাপত্য নিয়ে হিন্দুরা গর্ব করবেন। হিন্দুত্ববাদীরা বলেন, তাজমহল যেমন হিন্দু মন্দির ছিল, মক্কার কাবাও একসময় হিন্দু মন্দির ছিল। টুইটার ফেসবুকজুড়ে মুসলিম মৌলবাদীরা যেমন তাদের হিন্দু বিদ্বেষ ছড়িয়ে বেড়ান। হিন্দু মৌলবাদীরাও এখন তাই করছেন, মুসলিম বিদ্বেষ ছড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। তাজমহলের ইতিহাস রচনা করছেন। সাধারণ হিন্দুরা বিশ্বাস করছেন এই ইতিহাস। ১৯৮৯ সালে পি এন ওক নামে এক লোক বলেছিলেন, তাজমহল আসলে তেজোমহল নামের একটি শিবমন্দির, ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেও একসময় একটি শিবমন্দির ছিল। এই পি এন ওককে কেউ তখন গুরুত্ব দেননি। আজ তাঁর সেই হাস্যকর দাবিগুলোকেই অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তাজমহলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি খানিকটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। যে হারে মুসলিম বিদ্বেষী হয়ে উঠছে হিন্দুরা, মনে হয় তাজমহল যত্নহীন পড়ে থাকবে, নয় একে শিবমন্দিরই বানিয়ে ফেলা হবে। শুনেছি কিছুদিন আগে তাজমহলে গিয়ে কয়েকজন হিন্দু মৌলবাদী শিবের মন্ত্র পড়ে পুজো টুজো দিয়ে এসেছেন। এটি যে আরো ঘটবে না তা হলফ করে বলা যায় না। হিন্দুত্ববাদী নেতারা সাধারণ হিন্দুর মাথা নষ্ট করছেন প্রতিদিন। ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হিন্দু। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের দেশ যদি মুসলিম রাষ্ট্র হতে পারে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর দেশ কেন হিন্দু রাষ্ট্র হবে না! এই হলো তাদের কথা। মৌলবাদীরা কোনও দেশের মঙ্গল আনে না, না মুসলমানের দেশে, না হিন্দুর দেশে। আশা করি দুর্যোগ কাটবে।

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।

 

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterEmail this to someoneShare on LinkedIn