পীর হাবিবুর রহমান-

জাতীয় শোক দিবস গেছে। শোকের মাস শেষ হয়নি। আর নেতৃত্বের সেই শূন্যতার ক্ষতি অনন্তকাল জাতিকে বহন করতে হবে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক মর্মান্তিক হত্যাকান্ডটি ঘটেছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে। আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবার-পরিজনসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে এ দেশের বিপথগামী সেনা কর্মকর্তারা হত্যা করেছিল ধানমন্ডির বাড়িটিতে। যে বাড়িটি আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের ঠিকানা। ৩২ নম্বর বললেই আর কিছু বলতে হয় না। সেই রক্তের ওপর দিয়ে বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরের ভূমিকায় এসেছিল খন্দকার মোশতাক আহমদ। যাকে মুক্তিযুদ্ধ থেকে সবাই চিনলেও বঙ্গবন্ধু চিনলেন না। একটা বিষধর কালসাপকে তিনি বিশ্বাস করে পাশেই রেখেছিলেন। দেশি-বিদেশি অনেকেই সতর্ক করলেও বঙ্গবন্ধু আমলে নেননি। ষড়যন্ত্র চারদিকে ডালপালা মেলে গভীর অন্ধকার নেমেছিল। চারদিকেই একটা কিছু ঘটছে এমন আলোচনাও ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে কেউ সতর্ক করে বিশ্বাস করাতে পারেনি। পাকিস্তানিরা যাকে হত্যা করতে পারেনি তাকে দেশের সন্তানরা হত্যা করবে বিশ্বাসই করতেন না। অথচ হত্যাকান্ড শেষে সংবিধান লঙ্ঘন করে অবৈধ সরকার গঠন ও খুনিদের উল্লাস চলছিল। সামরিক শাসন আর কারফিউতে জনগণ স্তম্ভিত নির্বাক বেদনাহত। সামরিক নেতৃত্ব, সিভিল প্রশাসন খুনিদের কাছে আনুগত্য প্রকাশ করেছিল। কেউ কাপুরুষের মতো, কেউ ষড়যন্ত্রের নেপথ্য নায়ক হয়ে। বাকশাল গঠনে অগোছালো দলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিরোধের ডাক দিতে পারেনি। সামরিক নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড প্রতিরোধে যেমন ব্যর্থ হয়েছে তেমনি ব্যর্থ হয়েছে একদল খুনির শাসন প্রতিরোধ করে সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রাখতে। যখন বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রীরা খুনি মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিচ্ছিলেন, কেউবা অনুষ্ঠান পরিচালনা করছিলেন আর কেউ উপভোগ করছিলেন, উপস্থিত হয়ে বৈধতা দিয়েছিলেন তখন ধানমন্ডির বাড়িটিতে অনাদরে পড়ে ছিল জাতির পিতার বুলেটবিদ্ধ রক্তাক্ত লাশ। যিনি জীবনের ১৪ বছর কারাগারে কাটিয়ে, দুবার ফাঁসির মুখেও আপস না করে বাঙালি জাতিকে এক মোহনায় এনে কী কঠিন সংগ্রামে বাংলাদেশের জন্ম দিলেন তাঁকেই নিজ দেশের খুনিরা হত্যা করেছিল। তাঁর লাশকেও তাঁরা সেদিন ভয় পেয়েছিল। কড়া পাহারায় হেলিকপ্টারে করে টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে কবর দিতে চাইলে ইমামের আপত্তিতে গোসল কাফন ও জানাজা পরিয়ে দাফন করা হয়। জানাজায় বন্দুকের মুখে মানুষকে শরিক হতে দেওয়া হয়নি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর সামরিক নেতৃত্ব খুনিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তাদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ লজ্জা গ্লানিকরই নয় অপার রহস্যের। একদিকে ক্যু-পাল্টা ক্যু, আরেকদিকে জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা। Bangladesh Pratidinআওয়ামী লীগ নেতাদের দেশজুড়ে নির্যাতন করে কারাগারে নিক্ষেপ, কেউবা দেশান্তরি। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমের নেতৃত্বে প্রতিরোধযুদ্ধে গেছেন ১৮ হাজার তরুণ নেতা। বঙ্গবন্ধু দ্রুত যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা দেশকে ঘুরে দাঁড় করিয়েছিলেন অথচ তাঁকে দুই দন্ড শান্তি দেওয়া হয়নি। দেশ-বিদেশের ষড়যন্ত্রে দলে ভাঙন। কি উগ্র হঠকারিতা। জ্বালাও-পোড়াও হত্যাকান্ড। মুজিব উৎখাতের নামে নাশকতা। শ্রেণিশত্রু খতমের নামে সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টির গোপন সন্ত্রাস তান্ডব। অতিবামদের তৎপরতা আর আওয়ামী লীগের একটি উন্নাসিক নেতা-কর্মী ও নানামুখী অপপ্রচার ও হত্যাকান্ডের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল। সেনাশাসক জিয়া সায়েমকে সরিয়ে এলেন ক্ষমতায়। সেই অন্ধকার সামরিক শাসনের জমানায় কত ফাঁসি দিলেন! বঙ্গবন্ধুর আদর্শের নেতা-কর্মীদের দমন-নির্যাতন আর কারাদহন দিলেন। তবু বঙ্গবন্ধুর আদর্শে নেতা-কর্মীরা ঘুরে দাঁড়ালেন। ক্ষমতার ১২ বছরে আজ গোটা বাংলাদেশ যেন আওয়ামী লীগ। চারদিকে মুজিব ও শেখ হাসিনার বন্দনা চলছে। অথচ সেই ’৭৫-উত্তর অন্ধকার সময়ে আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগ রাজপথে কোনো মিত্রের সন্ধান পায়নি। মস্কোপন্থিরা গেলেন জিয়ার খাল কাটা বিপ্লবে। উগ্রপন্থি ও চীনা অতিবিপ্লবীদের চলল মুজিববিদ্বেষ, আওয়ামী লীগবিরোধী তৎপরতা। কী ভয়ংকর দুঃসময় বঙ্গবন্ধুর আদর্শে পথহাঁটা নেতা-কর্মীদের। একদিকে মার্শাল ল, আরেকদিকে উগ্র রাজনৈতিক শক্তির নানামুখী অপপ্রচার আর প্রতিরোধ। আজকের আওয়ামী লীগের সবাইকে সেই কঠিন সময় মোকাবিলা করা দেখতে হয়নি। আজকাল মনে হয় সেই সময় কেউ আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনীতি করেনি।

চীনা অতিবাম আর অতিডান মুসলিম লীগ নেতাদের সঙ্গে একদল মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে জিয়া গড়লেন ককটেল পার্টি বিএনপি। সেই কঠিন দিনগুলোয় ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ মহান নেতার আদর্শে নিজেদের সুসংগঠিত শক্তিশালী করলেন। দেশের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগের ফলাফল ছিল আশার আলো। সেদিন ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর নামটাই নিষিদ্ধ করেনি হত্যাকান্ডের বিচার বন্ধে ইনডেমনিটি আইনকে বৈধতাই দেওয়া হয়নি, সংবিধান থেকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের অর্জনগুলো মুছে ফেলা হয়। সে সময় থেকেই বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দাবিতে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে হরতাল হতো। আর পোস্টার হতো ‘কাঁদো বাঙালি কাঁদো’। আমার স্কুল থেকে গোটা ছাত্রজীবনেই স্লোগান ছিল, ‘এক মুজিবের রক্ত থেকে লক্ষ মুজিব জন্ম নেবে’, ‘এক মুজিব লোকান্তরে লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে’। অন্নদাশঙ্কর রায় আর কবি নির্মলেন্দু গুণের লেখা ছিল সেদিন আমাদের প্রাণশক্তি। সেদিন আর কোনো দল বিচারও চায়নি, শোক দিবসও পালন করেনি। খুনিরা দম্ভে নাজাত দিবস পালন করত। অবশেষে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা দলের সভানেত্রী হয়ে এলেন আর লড়াইয়ে নামলেন। সামরিক শাসনের অবসানের পর দলকে ক্ষমতায় এনে সেই আগস্ট হত্যাকান্ডের বিচার করলেন। ঘাতকদের ফাঁসি হলো। জাতি অভিশাপমুক্ত হলো। কেবল ষড়যন্ত্রের চিত্রনাট্য উন্মোচন হয়নি আজও, ষড়যন্ত্রের নেপথ্য কুশীলবদের মুখ উন্মোচিত হয়নি।

জাতির পিতাকে হারানোর বেদনা ও শূন্যতা পূরণ হলো না। এমন দীর্ঘদেহী সুদর্শন পুরুষ ও বাঙালি যিনি গোটা দেশ ও জনগণকে ভালোবাসতেন এবং বিশ্বরাজনীতির এমন মহানায়ক রাজনীতির কবি আর কোনো দিন আসবেন না। তাঁকে হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত রাষ্ট্রের আদর্শকেই হত্যা করেনি, দেশের আত্মাকেই হত্যা করেছে। বঙ্গবন্ধুর নির্লোভ দেশপ্রেমের আদর্শকেই আজ চিন্তা-চেতনায় লালন করে কর্মে প্রয়োগ বড় দায়িত্ব। তিনি জাতির পিতা, জাতির নেতা। বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশের আদর্শ। বাংলাদেশের আরেক নাম বঙ্গবন্ধু। শোকের মাসে কেবল কালো শোকগাথায় স্মৃতিচারণা আর আলোচনা, দোয়া মাহফিল আর গরু জবাই করে বিরিয়ানির উৎসব করলেই হবে না, তাঁর আদর্শ লালন ও বাস্তবায়নের প্রতিজ্ঞা নিতে হবে। তাঁর আত্মা সেদিন শান্তি পাবে যেদিন তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শোষণমুক্ত রাষ্ট্রে পরিণত হবে। তিনি আজীবন নির্লোভ সাদামাটা নিরাভরণ আত্মমর্যাদার জীবনযাপন করেছেন এবং তা অনুসরণের তাগিদ দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বারবার তিনি আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির তাগিদ দিয়েছেন। নেতা-কর্মীদের আজ উপলব্ধি করতে হবে সেই তাগিদ ফুরিয়ে যায়নি। তিনি পরিষ্কার বলেছেন, ‘আমার কৃষক আমার শ্রমিক ঘুষ খায় না, দুর্নীতি করে না, দুর্নীতি করে শিক্ষিতরা। কালোবাজারি আমার কৃষক-শ্রমিকরা হয় না, শিক্ষিতরাই হয়।’ আজকের বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর সেই তাগিদগুলো ফুরিয়ে যায়নি বরং বেড়েছে। সমাজে ঘুষ দুর্নীতি সীমাহীন। অর্থনৈতিক লুটপাট ও বিদেশে অর্থ পাচার নজিরবিহীন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসরণ করলে এ অন্যায়কে, এ দুর্নীতিকে রুখতেই হবে। মন্ত্রী-এমপি নেতাদের নির্লোভ চরিত্রে মানবসেবা করতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের জনগণের সঙ্গে মিশে যেতে হবে। তারা জনগণের খাদেম, সেবক, ভাই। তারা জনগণের বাপ, জনগণের ছেলে, জনগণের সন্তান। তাদের এ মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘সমস্ত সরকারি কর্মচারীদেরই আমি অনুরোধ করি, যাদের অর্থে আমাদের সংসার চলে তাদের সেবা করুন। গরিবের ওপর অত্যাচার করলে আল্লাহর কাছে তার জবাব দিতে হবে। জীবন অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী, এ কথা মনে রাখতে হবে। আমি বা আপনারা সবাই মৃত্যুর পর সামান্য কয়েক গজ কাপড় ছাড়া সঙ্গে আর কিছুই নিয়ে যাব না। তবে কেন আপনারা মানুষকে শোষণ করবেন, মানুষের ওপর অত্যাচার করবেন? দেশের সাধারণ মানুষ, যারা আজও দুঃখী, যারা আজও নিরন্তর সংগ্রাম করে বেঁচে আছে তাদের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখকে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির উপজীব্য করার জন্য শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসেবীদের প্রতি আহ্‌বান জানাচ্ছি।’ তাঁর মতো দেশপ্রেমিক নেতা, তাঁর মতো মানুষের প্রতি অতি গভীর মমত্ববোধ আর কেউ কখনো রাখেননি। তিনি পরিষ্কার বলেছেন, ‘আমার বড় শক্তি হচ্ছে আমি দেশের মানুষকে ভালোবাসি। আর বড় দুর্বলতা হচ্ছে মানুষকে বেশি ভালোবাসি।’ বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসলে, বঙ্গবন্ধুর রক্তঋণের উত্তরাধিকার বহন করলে তাঁর আদর্শ অন্তরের গভীরে ঠাঁই দিতে হবে। চিন্তা-চেতনায় লালন করতে হবে। এবং কর্মে তা প্রয়োগ করে প্রমাণ করতে হবে। লোভ-লালসা ও যেনতেন উপায়ে অর্থবিত্ত কামানোর নেশায় পতিত কেউ বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী হতে পারে না। তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ টেবিলের ওপরে রাখার জন্য নয়, হৃদয় দিয়ে পাঠ করে তা ধারণ করার এবং বাঙালির এ মহত্তম নেতাকে জানার এবং তা অনুশীলন করার।

মার্কিন সেনাবাহিনী আফগান তালেবানদের ক্ষমতাচ্যুত করে কঠোরভাবে দমন করে দুই দশক তাদের কর্মকান্ড বহাল রেখে চলে যেতেই সেই উগ্র তালেবানরা আবার অস্ত্রহাতে সংগঠিতভাবে আফগান সেনাবাহিনীকে নাস্তানাবুদ করে একের পর এক শহর দখল করতে করতে শেষ পর্যন্ত কাবুলের পতন ঘটায়। প্রেসিডেন্ট হাউস দখলে নেয়। তার আগেই রক্তপাতহীন এ অভ্যুত্থানের মুখে দেশটির প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি অন্য দেশে পালিয়ে যান এবং পদত্যাগ করেন। তালেবানরা সরকার গঠন এবং তাদের শাসন কায়েম করবে। সেই উগ্র তালেবান নেতা অন্ধ মোল্লা ওমরের পুত্র এ যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। আফগানিস্তানের ক্ষমতা ফের তালেবানের দখলে নেওয়া উপমহাদেশের জন্যই নয় বিশ্বের জন্য উদ্বেগ উৎকণ্ঠা ও পর্যবেক্ষণের বিষয়। দুই দশক শাসন করে প্রমাণ করেছে বন্দুকের জোরে দমন করে রাখা যায় না। জনগণকে তালেবানদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মনোজগতে পরিবর্তন ঘটিয়ে একটি শক্তিশালী অসাম্প্রদায়িক বা উদার রাজনৈতিক দল গঠনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ফের বোরকা কেনার হিড়িক। সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত। বিমানে চড়ে দেশ ছেড়ে পালানোর দৃশ্য অবলোকন করছে বিশ্ব। আফগানিস্তানের পাশে আরেক ব্যর্থরাষ্ট্র পাকিস্তান যেটি ধর্মান্ধ আর সেনাতন্ত্রে ক্ষতবিক্ষত। উগ্র সাম্প্রদায়িকতা রাষ্ট্রের চরিত্র। এ দুর্বল রাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবানদের সম্পর্ক গভীরে গড়ালে সার্কভুক্ত দেশগুলোয় কী প্রভাব পড়ে তা চিন্তার বিষয়। উগ্র ধর্মান্ধ শক্তি কখনো মানবতার কল্যাণ বয়ে আনে না। আফগানিস্তান ও পাকিস্তান দুটি সার্কের সদস্য। চীন তালেবানদের সঙ্গে সম্পর্কের চুক্তি করে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র সৈন্য প্রত্যাহারের আগে তালেবানদের সঙ্গে সম্পর্ক কোন জায়গায় রেখে গেছে তা সামনে দেখার বিষয়। একটি দেশের জনগণকে চরম বিপদের মুখে যে ফেলে গেছে তা দৃশ্যমান। চীন, রাশিয়া পাকিস্তান, ইরান তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। আমেরিকা দুটি শর্ত দিয়েছে। আর বাংলাদেশকে অনুরোধ করেছিল দেশত্যাগী আফগানদের আশ্রয় দিতে। আমাদের সরকার নাকচ করেছে। মামার বাড়ির আবদার যেন। ১২ লাখ রোহিঙ্গা ফিরিয়ে নেওয়ার তাগিদ নেই, উল্টো তাদের নাগরিকত্ব দানের অনুরোধ। তামাশারও সীমা আছে। আফগান নারী-পুরুষদের বিপদে ফেলে সৈন্য ফিরিয়ে নেওয়ার নেপথ্যে কোনো রহস্য বা গোপন সমঝোতা নেই তো? জনগণ বিপদে পড়লেও প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি গাড়ি ও হেলিকপ্টার ভরে বিপুল টাকা নিয়ে গেছেন। আফগান যুদ্ধে নারী-শিশুরাও জীবন দিয়েছে। অন্যদিকে আফগান বাহিনীকে প্রশিক্ষিত করতে এবং সরঞ্জাম দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে। আল-কায়েদার আক্রমণের কারণে ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী তালেবান ও আল-কায়েদার স্থাপনায় হামলা শুরু করে। আর ১৩ নভেম্বর তালেবান সরকারের পতন ঘটে। ২০০৫ সালে তালেবানরা আত্মঘাতী হামলা শুরু করলে আফগানিস্তানে ন্যাশনাল আর্মি ও পুলিশ বাহিনী গড়তে হয় পশ্চিমা বাহিনীগুলোকে। এজন্য খরচ হয় ৯ হাজার কোটি ডলার। আর অবকাঠামো উন্নয়নে ১৪ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করেছে। আর আফগান সরকার পরিচালনায় ব্যয় করেছে সাড়ে ৩ হাজার কোটি ডলার। ১ লাখ মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। কিন্তু দুই দশক পর তালেবানদের আক্রমণের মুখে আফগান সরকার তাসের ঘরের মতো উড়ে গেল। এর বিচার-বিশ্লেষণ আন্তর্জাতিকভাবে এখন চলবে। ফলাফল আসলে কী দাঁড়াল। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অসাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় থাকলেও উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির তৎপরতা রয়েছে। জঙ্গিবাদ দমনের মতো শেখ হাসিনার সরকার এদেরও দমিয়ে রেখেছে। কিছুদিন আগে হেফাজতে ইসলাম যে উগ্রতা শুরু করেছিল তাদের উগপন্থি নেতাদের আটক না করলে আজকে তালেবানদের এ উত্থান ও ক্ষমতা দখলের মুখে তারা এখানে উল্লাস করত। উগ্র সাম্প্রদায়িকতাকে উসকানি দিত। বাংলাদেশের বড় শক্তি এখানকার মুসলমানরা আল্লাহভীরু ধর্মপ্রাণ কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। আর উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তিকে কখনই গ্রহণ করেনি।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterEmail this to someoneShare on LinkedIn