সুনামগঞ্জে প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুত ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের স্থান নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে আয়োজিত মত বিনিময় সভা থেকে সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনাপূর্বক উপযুক্ত একটি স্থানে প্রতিষ্ঠানটি স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন সভায় উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা। শনিবার বিকাল ৫টায় সুনামগঞ্জ পৌরসভা কার্যালয়ে পৌর মেয়র আয়ুব বখত জগলুলের আহ্বানে এ মত বিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। সভায় জনপ্রতিনিধি, সুশিল সমাজের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, মুক্তিাযোদ্ধা, আইনজীবী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রারম্ভিক বক্তব্যে পৌর মেয়র জগলুল বলেন, ‘শহর থেকে ১২ কিলোমিটর দূরে মেডিকেল কলেজের স্থান নির্বাচনের খবরে যখন বিভিন্ন মহলে বিতর্কের সৃষ্টি হওয়ার পরে এ ব্যাপরে আমাদের মাননীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে আমি যোগাগোগের চেষ্টা করে তাকে পাইনি। এই প্রতিষ্ঠানটি বাস্তবায়নের  ক্ষেত্রে তাঁর অনেক অবদান রয়েছে। কিন্তু স্থান নির্বাচনের বিষয়টি নিয়ে যেহেতু বির্তকের সৃষ্টি হয়েছে সেই হিসেবে আমরা সকলে নিয়ে তাঁর সঙ্গে বসে আলোচনা করতে চাই। যাতে আলোচনার ভিত্তিতে উপযুক্ত একটি স্থান নির্বাচনের মাধ্যমে এই বিতর্কের অবসান হয়।’ মেয়র বলেন, ‘আমার বিশ্বাস প্রতিমন্ত্রী মানুষের দাবির ন্যায্যতার পক্ষে থাকবেন এবং এই সমস্যা সমাধানের একটি দিক নির্দেশনা দিবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের নানাবিধ সুবিধার কথা বিবেচনা করে দেশের সবগুলো সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল যেখানে শহরের আশপাশে স্থাপন করা হয়েছে, সেখানে আমাদেরও দাবি থাকবে সুনামগঞ্জের জন্য প্রস্তাবিত মেডিকেল কলেজটি যেন শহর কিংবা শহরতলীতে স্থাপন করা হয় যাতে মেডিকেল কলেজ সংশ্লিষ্টরা শহরের সুযোগ সুবিধা সহজে নিতে পারেন।’
সভায় সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকট আব্দুল মজিদ বলেন, ‘এটা টেনারি নয় যে শহরের ভেতরে কিংবা আশপাশে করা যাবে না। স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে যারা দ্বিমত করছেন তারা রাজনীতি করছেন না। তাদের দ্বিমত ন্যায়সঙ্গত।  প্রতিষ্ঠানটি করার জন্য শহরের আশপাশে অনেক জায়গা আছে। আমাদেরকে কেন ১২ কিলোমিটার দূরে নিবেন। ওইখানে কোন নতুন শহর গড়ে ওঠবে না। আমরা আশা করি মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনমানুষের দাবির সঙ্গে একত্মতা পোষাণ করবেন।’
মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আলী আমজাদ বলেন, ‘মেডিকেল কলেজের জন্য যে স্থান নির্বাচন করা হয়েছে তার সঙ্গে আমি একমত নই। প্রতিমন্ত্রী মহোদয় আমাদের কাছের মানুষ। তাঁর সামনে আমারা বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরবে। বিজিবি ব্যাটালিয়ন অথবা জেলের বিপরীতে যাতে প্রতিষ্ঠনটি স্থাপন করা হয় এ ব্যাপরে উদ্যোগ নিতে অনুরোধ করবো।’
সনাকের সাবেক সভাপতি নূরুর রব চৌধুরী বলেন, ‘শহর থেকে দেড় দুই কিলোমিটার দূরে মেডিকেল কলেজ করলে ভাল হয়। যে জায়গা নির্বাচন করা হয়েছে সেটা অনেক দূরে। প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলার দরকার। প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলা প্রয়োজন। প্রতিমন্ত্রী একজন ভাল মানুষ। আশা করি তিনি আমাদের বিষয়টি গুরুত্ব দেবেন।’
সাবেক সিভিল সার্জন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হেকিম বলেন, ‘আমি সিভিল সার্জন থাকাকালীন সদর হাসপাতাল এলাকায় মেডিকেল কলেজের জন্য স্থান নির্বাচন করা হয়েছিল। বিষয়টি সঙ্গে একাত্ম হয়ে প্রতিমন্ত্রী জনাব এমএ মান্নান বলেছিলেন, আমি শহরকে বঞ্চিত করব না। কিন্তু পরবর্তীতে সেটা কিভাবে ১২ কিলোমিটর দূরে গেল সেটা আমার বোধগম্য নয়। সরকারি কর্মকর্তারা মন্ত্রীকে খুশি করতে অনেক সময় অনেক কিছু করেন। এ ক্ষেত্রে তেমনটা হয়েছে কি না দেখা দরকার।’
জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সৈয়দ শামছুল ইসলাম বলেন, ‘সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের আশপাশে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের অনেক খাস জায়গা আছে। এর মধ্য থেকে ভাল জায়গা নির্বাচন করে প্রতিষ্ঠানটি করলে সবাই উপকৃত হবে। এত দূরে করলে এর দীর্ঘমেয়াদি অসুবিধা আছে।’  হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ব মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন, ‘সুনামগঞ্জ শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে মেডিকেল কলেজ চাই না আমরা। শহরের ভেতরে কিংবা আশপাশে প্রতিষ্ঠানটি স্থাপন করা হোক। এ ব্যাপারে মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর সাথে দ্রুত আলোচনায় বসতে হবে।’
সিনিয়র আইনজীবী চাঁন মিয়া বলেন, ‘শত বছরে গড়ে ওঠেছে এই শহর। শহরকে বঞ্চিত করে শুধুমাত্র আঞ্চলিকতার কারণে ১২ কিলোমিটার দূরে যেন গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতিষ্ঠানটি স্থাপন করা না হয়। শহরকে কেন্দ্র করে মেডিকেল কলেজ হতে হবে।’  জেলা জাপা নেতা মোহাম্মদ আলী খোশনূর বলেন, ‘শহর থেকে এত দূরত্বে মেডিকেল কলেজ স্থাপন ন্যায়সঙ্গত নয়। আমরা চাই শহরের আশপাশে প্রতিষ্ঠানটি স্থাপন হোক। যে স্থান নির্বাচন করা হয়েছে  সেটি পরিবর্তন করা হোক।’ অ্যাডভোকেট শুকুর আলী বলেন, ‘মদনপুরে হলে জেলা শহরের উন্নয়ন ব্যাহত হবে। মদনপুরে হলে ডাক্তারের পরিবার পরিজন থাকবে শহরে, ডাক্তার থাকবেন মদনপুরে। এতে বিড়ম্বনার সৃষ্টি হবে।’ তিনি বলেন, ‘আঞ্চলিকতা উর্ধে ওঠে সিদ্ধান্তটি পুর্নমূল্যায়ন করতে হবে।’
জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডাভোকেট শেরেনূর আলী বলেন, ‘মদনপুর কেন্দ্রীক মেডিকেল কলেজ গড়ে ওঠলে ওখানে একটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠবে। আর এই সিন্ডিকেটের কাছে সবাইকে জিম্মি হতে হবে। এতে উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি হবে।’
জেলা পরিষদের সদস্য সৈয়দ তারিক হাসান দাউদ বলেন, ‘মেডিকেল কলেজ স্থাপন করার পর সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল অকার্যাকর হয়ে যাবে। অতীতেও এমন নজির আছে। কাজেই দুটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর রাখতে হলে শহর কিংবা শহরের আশপাশে প্রতিষ্ঠানটি স্থাপনের কোন বিকল্প নাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্থান পুর্নবিবেচনার বিষয়ে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব নূরুল হুদা মুকুটও একমত। এ ব্যাপারে কথা বলতে তিনি আমাকে বলেছেন।’
কুরবান নগর ইউপি চেয়ারম্যান আবুল বরকত বলেন, ‘শহর থেকে অনেক দূরে চলে যাওয়া মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরও কষ্ট হবে। কাজেই শহর কিংবা শহরে আশপাশে হওয়াই উত্তম।’  লক্ষণশ্রী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, ‘এ বির্তকের অবসান করতে মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলা দরকার। নতুন কারাগারের আশাপাশে স্থান নির্বাচন হলে সকলের জন্য ভাল হবে।’  জেলা জাসদ নেতা সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, ‘মদনপুরে হলে ওখানে কোন শহর গড়ে ওঠবে না, একটি ঘিঞ্জি গঞ্জ হবে। সিদ্ধান্তটি কিভাবে বাতিল করা যায় সেটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে।’ শ্রমিক নেতা সোহেল আহমদ বলেন, ‘আমরা সুনামগঞ্জের মানুষের সার্বিক সুবিধার্থে শহর কিংবা শহরতলীর পাশে মেডিকেল কলেজ স্থানপ করতে হবে। দূরে হলে ভাল ডাক্তার থাকবেন না। মানুষকে অসুবিধায় পড়তে হবে।’
মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন, জেলা নাটাব সভাপতি ধূর্জটি কুমার বসু, সুনামগঞ্জ চেম্বারের সিনিয়র সহ-সভাপতি আমিনুল হক, মুক্তিযোদ্ধা মালেক হোসেন পীর, সামাজসেবী এনামুল হক চৌধুরী, ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল হাই, ইউপি চেয়ারম্যান রওশন আলী, ইউপি চেয়ারম্যান মুকশেদ আলী, জেলা জাপা নেতা সাইফুর রহমান সমছু, উন্নয়ন কর্মী নির্মল ভট্টাচার্য্য,  আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট আক্তারুজ্জামান সেলিম, জেলা পরিষদ সদস্য আমিনুল ইসলাম সেলিম, জেলা জাপা নেতা জমিস উদ্দিন লাল, পৌর কাউন্সিলর হোসেন আহমদ রাসেল, চঞ্চল কুমার লোহ, সামসুজ্জামান স্বপন, ফজর নূর, গোলাম সাবেনীর সাবু, সাংবাদিক ম ফ র ফোরকান, মাহবুবুর রহমান পীর, মাসুম হেলাল, সেলিম আহমদ তালুকদার, হিমাদ্রী শেখর ভদ্র, শামছুল কাদির মিছবাহ, আমিনুল হক, অ্যাডভোকেট রুবেল আহমদ, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুস সালাস, অ্যাডভোকেট রুবেল আহমদ, ব্যবসায়ী রঞ্জিত কুমার দাস, চন্দন কুমার রায়, আ.লীগ নেতা যতীন্দ্র মোহন তালুকদার,  সমাজসেবী সুবিমল চক্রবর্তী চন্দন, ছাত্রনেতা ভজন পাল, প্রবাসী সুমন আহমেদ, উন্নয়ন কর্মী শফিকুজ্জামান চৌধুরী সজিব, ব্যবসায়ী সিরাজুল হক, ছাত্রনেতা আরিফুল আলম, আজহারুল ইসলাস শিপু, মো. কামাল হোসেন প্রমুখ।
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterEmail this to someoneShare on LinkedIn