হাসান হামিদ-

‘পরিচ্ছন্ন বছর-২০১৬’ উদ্বোধন উপলক্ষে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে একটি হাস্যকর মন্তব্য করেছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল। আমার খুব মনে আছে, তিনি সেদিন বলেছিলেন, ঢাকায় আগামী দেড় থেকে দুই বছর পর কোনো প্রকার ময়লা-আবর্জনা খুঁজে পাওয়া যাবে না! সেখানে তিনি বলেন, ‘দুই বছরের মধ্যে খোঁজলেও আপনারা আর ময়লা-আবর্জনা পাবেন না। এ জন্য আমাদের যা কিছু করা দরকার তাই করবো।’ সরকার তারপর কী কী করেছে আমরা প্রতিনিয়ত তা ঠের পাচ্ছি!

কিছুদিন আগে চলন্তিকা মোড়ের নীলগীতা রোডে একটি ম্যানহোল পরিষ্কার করতে গিয়ে সতের-আঠারো বছর বয়সী ওই তরুণ নিখোঁজ হয়। কিছু ময়লা পরিষ্কার করার পর পানির স্রোত বেড়ে যায় এবং তার টানে সে আরও ভেতরে ঢুকে যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে। আবার, গত ১৮ সেপ্টেম্বর  একটি অভিজাত পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীতে বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ নিয়ে প্রতি মাসে অন্তত ২০ কোটি টাকার বাণিজ্য হচ্ছে। বছরে এই টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ২৪০ কোটি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই ময়লা সংগ্রহ করা হয় এবং সিটি করপোরেশন নির্ধারিত ফির চেয়ে অনেক বেশি টাকা দিতে হয় করপোরেশনের বাসিন্দাদের। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের লোকজন, আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী বা তাঁদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা এই ময়লা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন।

পত্রিকার প্রতিবেদন ও ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি, প্রথমে যখন বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করা শুরু হয়, তখন ময়লা সংগ্রহকারীকে দিতে হতো ১০ টাকা। ২০০৯ সালে সিটি করপোরেশন ৩০ টাকা ফি নির্ধারণ করে দেয়। তবে সিটি করপোরেশন এই টাকার কোনো ভাগ পায় না। সেই ফি এখন ১০০ থেকে ১২০ টাকায় ঠেকেছে। অভিজাত এলাকাগুলোতে এই ফি আরও বেশি। ভবিষ্যতে হয়তো আরও বাড়বে। এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।  বেসরকারিভাবে যেসব প্রতিষ্ঠান ময়লা সংগ্রহ করে তাদের একটি সংগঠনও রয়েছে; নাম প্রাইমারি ওয়েস্ট কালেকশন সার্ভিস প্রোভাইডারস (পিডব্লিউসিএসপি)। এটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সহযোগী সংগঠন হিসেবে সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত। সংগঠনটি ইতিমধ্যে ময়লা নেওয়ার জন্য ফি বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করে অনেকেই হয়তো বড়লোক হচ্ছেন। কিন্তু এর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। সিটি করপোরেশন শুধু নির্ধারিত জায়গায় রাখা ময়লার কনটেইনার এবং ময়লা রাখার ঘর বা সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) থেকে ময়লা সংগ্রহ করে।

আমরা দেখেছি, প্রতিটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে ঢাকা মহানগরীকে তিলোত্তমা নগরীতে পরিণত করা থেকে সবুজ ঢাকা, বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন মেয়রপ্রার্থীরা। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয় না কখনোই। এ রকমই কি চলবে? সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের খুব কমই রাস্তার ময়লা ঝাড়ু দেওয়ার কাজটি ঠিকভাবে করেন। অভিজাত হিসেবে পরিচিত নয় এমন সব এলাকার অবস্থা খুবই নাজুক। সড়কের আশপাশে ময়লা পড়ে থাকে দিনের পর দিন। পরিষ্কার  করার নামটি কেউ করে না। একসময় এসব ময়লা মাটির সঙ্গে মিশে যায় কিংবা ড্রেনে পড়ে পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করে।

সিটি করপোরেশন সব সময় শহর পরিচ্ছন্ন না হওয়ার জন্য স্বল্প বাজেট ও জনবলের অভাবকে দায়ী করে থাকে। তাই যদি হবে তাহলে প্রথমে করণীয় হচ্ছে বাজেট ও লোকবল বাড়ানো। আর সেটা করা যদি সম্ভব না হয় তাহলে বেসরকারিভাবে বাসাবাড়ি থেকে যেভাবে টাকার বিনিময়ে ময়লা সংগ্রহ করা হচ্ছে, একইভাবে রাস্তাঘাট, অলিগলি পরিষ্কারের কাজটিও বেসরকারিভাবে করা যেতে পারে। ন্যায্য ও যুক্তিসংগত ফির বিনিময়ে এটা করা যেতেই পারে। শহরটা তো অন্তত পরিষ্কার থাকবে। তবে এই রাস্তাঘাট পরিষ্কার করার অছিলায় যাতে আবার কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য না হয়, সেটাও দেখতে হবে। তবে নগর অপরিচ্ছন্ন থাকার সব দায় সিটি করপোরেশনগুলোর ওপর না দিয়ে নিজেদের দিকেও তাকাতে হবে। আমরা নগরবাসী সবাই কি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকি? এই নগরটা এত নোংরা হয় সে আমরা করি বলে। আমাদের অনেকের স্বভাব হচ্ছে যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা। উন্নত দেশগুলোতে বাসাবাড়ি বা রাস্তাঘাট নোংরা করলে মোটা অঙ্কের অর্থ জরিমানা করা হয়। আমাদের দেশেও সে রকম জরিমানার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। তবেই যদি স্বভাব বদলায়।

বিশ্বব্যাংকের একটি সমীক্ষাতে বলা হয়েছে, ঢাকা শহরে প্রতিদিন বর্জ্য জমা হচ্ছে প্রায় ৭ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে গৃহস্থালি ও দোকান থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টন ময়লা তৈরি হয়। ঢাকায় এখন দুটি সিটি করপোরেশন। কিন্তু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এই দুই করপোরেশন খুব একটা সাফল্য দেখাতে পারেনি। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বাসাবাড়ির ময়লা দূর হলেও রাস্তাঘাটের অবস্থা খুবই করুণ। রাজধানীর খুব কম এলাকা আছে, যেখান থেকে নিয়মিত ময়লা অপসারণ করা হয়। আমরা আশাবাদী সামনে খুব ভালো কিছু হবে। শেষ করছি শামসুর রাহমানের কবিতা দিয়ে:

‘আস্তাবলের দিকে অন্ধকার, ঝুলছে নিষ্কম্প স্তব্ধতা;
আর সেই বেতো ঘোড়াটা অনেকক্ষণ ধরে ঝিমোচ্ছে
নিঃশব্দ কোনো আফিমখোরের মতো, মাঝে মাঝে শুধু
ফোলা পা নাড়ছে ঘাড় বাঁকিয়ে’।
(সেই ঘোড়াটা)

লেখক- গবেষক ও কবি, ঢাকা ।

 

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterEmail this to someoneShare on LinkedIn