০৮:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকট ভয়াবহ,স্বাস্থ্যসেবা ঝুঁকির মুখে

রিপোর্টার
  • সময় : ০২:০২:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬
  • / ১০ ভিউ

তাহিরপুর উপজেলার একমাত্র ৫০ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর তীব্র সংকট বিরাজ করছে। মঞ্জুরকৃত পদের তুলনায় বিপুল সংখ্যক পদ শূন্য থাকায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। ১৯৭৮ সালে উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের প্রায় তিন লাখ মানুষের স্বাস্থ্য সেবার লক্ষে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি স্থাপিত হলেও এখনও আধুনিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাওরাঞ্চলের মানুষ। বিশেষ করে ভোগান্তিতে পড়ছেন শিশুসহ গর্ভবতি মায়েরা।

তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সূত্রে জানা যায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ২৪ টি চিকিৎসকের পদ মঞ্জুর থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৬ জন। ১৮ পদ শূন্য রয়েছে। এরমধ্যে জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ও অবস, এনাস্থেসিয়া) পদে ৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১ জন। এছাড়া ১৩টি মেডিকেল অফিসারের পদের মধ্যে কর্মরত আছেন ২ জন। ১১টি পদ শূন্য রয়েছে। ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারের ৮টি পদের একটিও বর্তমানে পূরণ হয়নি।

অন্যদিকে আবাসিক মেডিকেল অফিসারের ১টি পদ পূরণ থাকলেও জরুরি বিভাগে চিকিৎসকের অভাবের কারণে রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। জুনিয়র কনসালটেন্ট (এনাস্থেসিয়া) পদে একজন চিকিৎসক সংযুক্তিতে সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যা সদর হাসপাতালে কর্মরত থাকায় স্থানীয়ভাবে সেই পদটিও কার্যত শূন্য রয়েছে। নার্স ও মিডওয়াইফ পদেও রয়েছে ঘাটতি। মোট ১৯টি নার্স ও মিডওয়াইফ পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৩ জন। শূন্য রয়েছে ৬ পদ। এরমধ্যে ৩ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স শিক্ষা ছুটিতে থাকায় বাস্তবে কর্মরত নার্সের সংখ্যা আরও কমে গেছে।

এছাড়া মেডিকেল টেকনোলজিস্টের ৬ পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ১ জন, ৫টি পদ শূন্য রয়েছে। ল্যাব, ডেন্টাল ও রেডিওলজি বিভাগে প্রয়োজনীয় টেকনোলজিস্ট না থাকায় রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে বাইরে থেকে পরীক্ষা—নিরীক্ষা করতে হচ্ছে। ছাত্রদল নেতা রাহুল জানান, চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিমাণে চিকিৎসাসেবা মিলছে না। বিশেষ করে জরুরি বিভাগ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে রোগীরা জেলা সদর বা সিলেটে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত একজন চিকিৎসক জানান, প্রতিদিন শিশু ও নারীসহ অসংখ্য রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসছেন। চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে তাদের স্বাস্থ্যসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। চিকিৎসা নিতে আসা আসমা বেগম জানান, চিকিৎসক সংকট এখানে নিত্যদিনের ঘটনা। একটু জটিল রোগী হলেই রেফার করে দেওয়া হয়। গর্ভবতী মায়ের চিকিৎসাও অনেক সময় এখানে করানো যায় না। সিজারের প্রয়োজন হলে সন্তান সম্ভাবাক জেলা শহর অথবা সিলেটে নিয়ে যেতে হয়।

তাহিরপুর সদর ইউপি চেয়ারম্যান জুনাব আলী বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি অনেক পুরনো। এখানে ভবন আছে, চিকিৎসকদের থাকার ব্যবস্থা আছে, রাস্তাঘাট আগের চেয়ে অনেক ভালো। তবুও কেন চিকিৎসকরা এখানে আসেন না বা থাকেন না, তা বুঝতে পারছি না। তিনি দ্রুত চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ দিতে নতুন সরকারের কাছে জোর দাবি জানান।

তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নওশাদ আহমেদ বলেন, শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদা পাঠানো হচ্ছে। বর্তমানে সীমিত সংখ্যক চিকিৎসক দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দিতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।জনবল সংকট নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলে এখানে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হবে। সিভিল সার্জন জসিম উদ্দিন বলেন, বার বার চাহিদা পাঠিয়েও আমরা চিকিৎসক পাচ্ছি না। একই চিত্র আরও কয়েকটি উপজেলায়।

তিনি বলেন, উপর থেকে জানানো হয় তাহিরপুর চিকিৎসক যেতে চান না, তবে এখানে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসক প্রয়োজন। স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকটের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে, যাতে স্থানীয় মানুষজন ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত না হন।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকট ভয়াবহ,স্বাস্থ্যসেবা ঝুঁকির মুখে

সময় : ০২:০২:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

তাহিরপুর উপজেলার একমাত্র ৫০ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর তীব্র সংকট বিরাজ করছে। মঞ্জুরকৃত পদের তুলনায় বিপুল সংখ্যক পদ শূন্য থাকায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। ১৯৭৮ সালে উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের প্রায় তিন লাখ মানুষের স্বাস্থ্য সেবার লক্ষে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি স্থাপিত হলেও এখনও আধুনিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাওরাঞ্চলের মানুষ। বিশেষ করে ভোগান্তিতে পড়ছেন শিশুসহ গর্ভবতি মায়েরা।

তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সূত্রে জানা যায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ২৪ টি চিকিৎসকের পদ মঞ্জুর থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৬ জন। ১৮ পদ শূন্য রয়েছে। এরমধ্যে জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ও অবস, এনাস্থেসিয়া) পদে ৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১ জন। এছাড়া ১৩টি মেডিকেল অফিসারের পদের মধ্যে কর্মরত আছেন ২ জন। ১১টি পদ শূন্য রয়েছে। ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারের ৮টি পদের একটিও বর্তমানে পূরণ হয়নি।

অন্যদিকে আবাসিক মেডিকেল অফিসারের ১টি পদ পূরণ থাকলেও জরুরি বিভাগে চিকিৎসকের অভাবের কারণে রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। জুনিয়র কনসালটেন্ট (এনাস্থেসিয়া) পদে একজন চিকিৎসক সংযুক্তিতে সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যা সদর হাসপাতালে কর্মরত থাকায় স্থানীয়ভাবে সেই পদটিও কার্যত শূন্য রয়েছে। নার্স ও মিডওয়াইফ পদেও রয়েছে ঘাটতি। মোট ১৯টি নার্স ও মিডওয়াইফ পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৩ জন। শূন্য রয়েছে ৬ পদ। এরমধ্যে ৩ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স শিক্ষা ছুটিতে থাকায় বাস্তবে কর্মরত নার্সের সংখ্যা আরও কমে গেছে।

এছাড়া মেডিকেল টেকনোলজিস্টের ৬ পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ১ জন, ৫টি পদ শূন্য রয়েছে। ল্যাব, ডেন্টাল ও রেডিওলজি বিভাগে প্রয়োজনীয় টেকনোলজিস্ট না থাকায় রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে বাইরে থেকে পরীক্ষা—নিরীক্ষা করতে হচ্ছে। ছাত্রদল নেতা রাহুল জানান, চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিমাণে চিকিৎসাসেবা মিলছে না। বিশেষ করে জরুরি বিভাগ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে রোগীরা জেলা সদর বা সিলেটে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত একজন চিকিৎসক জানান, প্রতিদিন শিশু ও নারীসহ অসংখ্য রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসছেন। চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে তাদের স্বাস্থ্যসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। চিকিৎসা নিতে আসা আসমা বেগম জানান, চিকিৎসক সংকট এখানে নিত্যদিনের ঘটনা। একটু জটিল রোগী হলেই রেফার করে দেওয়া হয়। গর্ভবতী মায়ের চিকিৎসাও অনেক সময় এখানে করানো যায় না। সিজারের প্রয়োজন হলে সন্তান সম্ভাবাক জেলা শহর অথবা সিলেটে নিয়ে যেতে হয়।

তাহিরপুর সদর ইউপি চেয়ারম্যান জুনাব আলী বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি অনেক পুরনো। এখানে ভবন আছে, চিকিৎসকদের থাকার ব্যবস্থা আছে, রাস্তাঘাট আগের চেয়ে অনেক ভালো। তবুও কেন চিকিৎসকরা এখানে আসেন না বা থাকেন না, তা বুঝতে পারছি না। তিনি দ্রুত চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ দিতে নতুন সরকারের কাছে জোর দাবি জানান।

তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নওশাদ আহমেদ বলেন, শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদা পাঠানো হচ্ছে। বর্তমানে সীমিত সংখ্যক চিকিৎসক দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দিতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।জনবল সংকট নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলে এখানে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হবে। সিভিল সার্জন জসিম উদ্দিন বলেন, বার বার চাহিদা পাঠিয়েও আমরা চিকিৎসক পাচ্ছি না। একই চিত্র আরও কয়েকটি উপজেলায়।

তিনি বলেন, উপর থেকে জানানো হয় তাহিরপুর চিকিৎসক যেতে চান না, তবে এখানে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসক প্রয়োজন। স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকটের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে, যাতে স্থানীয় মানুষজন ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত না হন।