রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য, উপাচার্য, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, এমনকি ক্যাম্পাসে সক্রিয় ছাত্র সংগঠনগুলোসহ সবাই চায়- তারপরও ২৭ বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন হচ্ছে না। কিন্তু কেন? এ প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের সবার মধ্যে ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। ২৯ জুলাই ছাত্র প্রতিনিধি ছাড়া উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের প্রতিবাদ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের হাতাহাতির ঘটনায় ডাকসু নির্বাচন দাবির আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন-কর্মসূচি পালন করছে শিক্ষার্থীরা।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডাকসু নির্বাচন দিতে রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মো. আবদুল হামিদের তাগিদকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এরপরেও ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ না নেয়ায় অজানা রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। ২ যুগেরও বেশি সময় ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়াকে ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বৈরতান্ত্রিক’ মনোভাবের বহির্প্রকাশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ছাত্রদের মতামত প্রদানের যে অধিকার দিয়েছে- রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত ক্ষমতাকে ভয় পেয়ে যুগ যুগ ধরে তা রুদ্ধ করে রেখেছে।

জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৪ সালে। ১৯২৪-২৫ সালে প্রথম ডাকসুর ভিপি মনোনীত করা হয়। ডাকসুর প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৩ সালে। এর আগে ভিপি মনোনীত ছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ডাকসু গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। ডাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯০ সালে। সে বছর ৬ জুন ডাকসু ও ১৮ টি আবাসিক হল সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর দীর্ঘ ২৭ বছরে ডাকসু নির্বাচন দেয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠনসহ সব সংগঠনের নিয়মিত নির্বাচন হলেও ছাত্রদের প্রতিনিধি নির্বাচনে ডাকসু নির্বাচন দেয়া হয়নি।

সবাই চাইলে নির্বাচন কেন নয়: রাষ্ট্রপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আচার্য মো. আবদুল হামিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ চলতি বছরের সমাবর্তনে (৫০তম) বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন ইজ আ মাস্ট (হতেই হবে)। নির্বাচন না হলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে শূন্যতার সৃষ্টি হবে।’ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদও ডাকসুর পক্ষে তার অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বিভিন্ন সময় তার বক্তব্যে ডাকসু নির্বাচনের পক্ষে অবস্থানের কথা উল্লেখ করেছেন। সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ, বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র ফ্রন্টসহ ক্যাম্পাসে সক্রিয় সব ছাত্র সংগঠনই ডাকসুর দাবি জানাচ্ছে। সর্বশেষ ২৯ জুলাই থেকে ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে টানা আন্দোলন করে আসছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে ক্যাম্পাসে সব ছাত্র সংগঠনকে নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনার আয়োজন করেন তারা। প্রশ্ন উঠেছে, সবাই যদি চায় তাহলে ডাকসু নির্বাচন কেন হচ্ছে না?

এ বিষয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, ২৭ বছর ধরে ডাকসু নির্বাচন না দেয়ার প্রধান কারণ হল শাসক দলের ভয়। তারা মুখে মুখে ডাকসুর কথা বললেও অন্তরে ডাকসুকে মেনে নিতে পারে না। ক্ষমতার মসনদ আরও পাকাপোক্ত করার নষ্ট প্রয়াস থেকেই তারা ডাকসু নির্বাচন দিতে আগ্রহ দেখায় না। আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও চায় না, ডাকসু নির্বাচন দিয়ে ছাত্র প্রতিনিধিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে। এতে করে তারা নিজেদের মতো করে প্রশাসন পরিচালনার সুযোগ পায়। তারা আরও বলছেন, ডাকসু থাকলে ছাত্রদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধার প্রশ্নকে ভিত্তি করে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক বিভিন্ন অসঙ্গতি নিয়ে ছাত্ররা সোচ্চার হবে। আর শাসকগোষ্ঠীর বড় ভয়ের জায়গা এটি। এছাড়া ছাত্র সংগঠনগুলো যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি করে, সে ক্ষেত্রে নিজ দলের ছাত্র সংগঠন ডাকসু নির্বাচনে জয়ী হতে না পারলে ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় তো আছেই।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের অভিজ্ঞতা হল, সরকার চায় না বলেই ডাকসু নির্বাচন হয় না। সরকার ভাবে, ডাকসু হলে ছাত্রদের মতামত তাদের পক্ষে নাও যেতে পারে। আরেকটা সমস্যা হল, এ নির্বাচনটাকে অনেক বেশি ফোকাস করা হয়। এটাকে সরকারের জনপ্রিয়তার অংশ হিসেবে নেয়া হয়। ফলে সরকার চায় না, তাদের জনপ্রিয়তার ভাটা প্রকাশ্যে আসুক। ফলে তারা নির্বাচন দেয় না। আর নির্বাচন কর্তৃপক্ষও বিষয়টি নিয়ে সেভাবে ভাবে না। যখন বিষয়টি আলোচনায় আসে তখন শুধু এটি নিয়ে কথা হয়।’ এ সময় তিনি ডাকসু নির্বাচনকে অন্যান্য নির্বাচনের মতো একটি নিয়মিত ও স্বাভাবিক কার্যক্রম হিসেবে গ্রহণেরও পরামর্শ দেন।

এ বিষয়ে ডাকসুর সাবেক ভিপি (১৯৯০) আমানউল্লাহ আমান বলেন, ‘আমরা জাতীয় নেতৃত্বে এসেছি ডাকসুর কল্যাণে। কিন্তু দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে ডাকসু নির্বাচন না দেয়ায় জাতীয় নেতৃত্বে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। ডাকসু নির্বাচনের অনুপস্থিতিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’

নির্বাচন না দেয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘সরকার ভাবছে ডাকসু নির্বাচন দিলে তাদের ছাত্র সংগঠন নেতৃত্বে আসতে পারবে না। তাই তারা নির্বাচন দিচ্ছে না। নির্বাচনের পথে আরেকটি অন্যতম বড় অন্তরায় হল- ক্যাম্পাসে সব ছাত্র সংগঠনের সহাবস্থান না থাকা। নির্বাচনের জন্য সবার আগে ক্যাম্পাসে সব ছাত্র সংগঠনের কথা বলার ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে।’

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ডাকসুর ভিপি (১৯৭২) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনের ঘোষণা দেবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর (রাষ্ট্রপতি) ডাকসু নির্বাচনের নির্দেশ দেয়ার পরেও উপাচার্য নির্বাচনের আয়োজন না করে অন্যায় করছেন। এটা কোনোভাবেই উচিত নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি সব সময় দাবি জানিয়ে এসেছি, একাডেমিক ক্যালেন্ডারে অন্য বিষয়ের পাশাপাশি ডাকসু নির্বাচনের তারিখ থাকতে হবে। সময়মতো পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা না করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যেভাবে ব্যবস্থা নেয়া হয়, সেভাবে ডাকসু নির্বাচন না দিলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

‘ডাকসুর দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীবৃন্দ’র সমন্বয়ক মাসুদ আল মাহদী বলেন, ‘ডাকসুর কথা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শুধু মুখে-মুখেই বলেন। বাস্তবে তা দিতে চান না। যার বড় প্রমাণ হল, যদি সত্যিকারার্থেই ডাকসু নির্বাচন চাইতেন, তাহলে এ বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন। কিন্তু এ ধরনের কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম আমরা দেখিনি। যেহেতু ডাকসু একটি গণতান্ত্রিক দাবি, তাই কেউ এটিকে অস্বীকার করতে পারেন না। সেজন্য বাধ্য হয়েই ডাকসুর পক্ষে কথা বলেন, কিন্তু বাস্তবে কিছুই করেন না।’

নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি আসে, বাস্তবতা আসে না: ১৯৯০ থেকে বিভিন্ন সময় ডাকসু নির্বাচনের ‘মুলা ঝুলিয়েছেন’ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তিরা। কিন্তু তা শুধু ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। ২০১৭ সালে এসেও তা বাস্তবতার মুখ দেখেনি। জানা গেছে, ১৯৯০ সালের ৬ জুন সর্বশেষ নির্বাচনের এক বছর পর ১৯৯১ সালের ১২ জুন তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। তখন ছাত্রনেতারা ছাত্রত্ব ঠিক রেখে প্রার্থী হওয়ার জন্য বিশেষ ভর্তির দাবি করেন। এ নিয়ে সৃষ্ট সহিংসতায় নির্বাচন ভেস্তে যায়। ১৯৯৪ সালের এপ্রিলে সে সময়ের ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ ডাকসুর তফসিল ঘোষণা করেন। কিন্তু নির্বাচনের পরিবেশ না থাকার দোহাইয়ে ছাত্রলীগের বাধার মুখে নির্বাচন স্থগিত হয়। ১৯৯৫ সালেও ডাকসুর তফসিল ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সেবারও একইভাবে নির্বাচন আর অনুষ্ঠিত হয়নি।

১৯৯৬ সালে অধ্যাপক একে আজাদ চৌধুরী ভিসির দায়িত্ব নেয়ার পর একাধিকবার ডাকসু নির্বাচনের সময়সীমার কথা জানান। কিন্তু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় ব্যর্থ হন। ১৯৯৭ সালে বঙ্গবন্ধু হলে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ছাত্রদল নেতা আরিফ হোসেন তাজ খুন হন। ওই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি ১৯৯৮ সালের ২৩ মে রিপোর্ট দেয়। রিপোর্টে তখনকার মেয়াদোত্তীর্ণ ডাকসু ভেঙে দেয়া এবং পরবর্তী ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুপারিশ করা হয়। সে অনুযায়ী ২৭ মে সিন্ডিকেট সভায় ডাকসু ভেঙে দেয়া হয়। এরপরও অধ্যাপক একে আজাদ চৌধুরী দু’বার নির্বাচনের উদ্যোগ নেন। কিন্তু তাও আলোর মুখ দেখেনি। তৎকালীন উপাচার্যের দাবি, সেই সময়কার বিরোধী ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের অসহযোগিতার কারণেই ডাকসু নির্বাচন দেয়া সম্ভব হয়নি। সে সময় ডাকসুর জন্য গঠিত নতুন (সংশোধিত) গঠনতন্ত্রে ডাকসু ভাঙার ৪ মাসের মধ্যে পুনরায় নির্বাচনের কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত ডাকসুর তফসিল ঘোষণা হয়নি। ফলে নেতৃত্ব তৈরির ‘কারখানা’ হিসেবে পরিচিত ডাকসু আর কার্যকর হয়ে উঠেনি।

২০০৫ সালের মে মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার ভিসি অধ্যাপক এসএমএ ফায়েজ ওই বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের ঘোষণা দেন। ছাত্রদল ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে একাধিকবার মিছিল, সমাবেশ ও ভিসির কাছে স্মারকলিপিও দেয়। তবে শেষ পর্যন্ত আর সে দাবি আলোর মুখ দেখেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পরও ডাকসু নির্বাচনের জোর দাবি ওঠে। দাবি গড়ায় আদালত পর্যন্ত। শিক্ষার্থীরা পৃথক মঞ্চ করে আন্দোলন গড়ে তোলেন। এরপর বিভিন্ন সময় দফায় দফায় ডাকসু নির্বাচনের দাবি ওঠে। সর্বশেষ ২৯ জুলাই ছাত্র প্রতিনিধি ছাড়া উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। তারপর থেকেই ডাকসুর দাবিতে টানা আন্দোলন করে আসছে শিক্ষার্থীরা। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্বাচনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterEmail this to someoneShare on LinkedIn