বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার আবুয়া ও রঙ্গিয়ারচর নদীপথে ট্যাক্স আদায়ের নামে চলছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি। স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি জানলেও এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া সুলতানা বলছেন, ‘আবুয়া নদীতে চাঁদাবাজির বিষয় সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। কিন্তু ভ্রাম্যমাণ আদালত পৌঁছার আগেই এরা (চাঁদাবাজরা) খবর পেয়ে পালিয়ে যায়। আমরা নদীপথকে চাঁদাবাজমুক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছি।’ অন্যদিকে ফতেহপুর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের প্যাডে আবুয়া নদীপথে চলাচলকারী নৌযান থেকে ‘ট্যাক্স’ আদায়ের জন্য কালেক্টর নিয়োগ দিয়েছেন বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ,ভাইস চেয়ারম্যান সুলেমান তালুকদার ও উপজেলার ফতেপুর ইউপি চেয়ারম্যান রনজিত চৌধুরী রাজন। চলতি বছরের ১৩ মার্চ ‘ইউনিয়ন পরিষদের রাজস্ব বৃদ্ধির স্বার্থে ট্যাক্স আদায়ের জন্য’ সুনামগঞ্জ শহরের দক্ষিণ আরপিননগরের বাসিন্দা সোয়েব চৌধুরীকে ১৪২৪ বাংলা সনের ৩০ চৈত্র পর্যন্ত মেয়াদে ‘কালেক্টর’ হিসেবে তারা নিয়োগ দিয়েছেন। নিয়োগপ্রাপ্ত কথিত কালেক্টর সোয়েব চৌধুরী আবার ফতেপুর ইউনিয়নের সবুজ মিয়ার মিয়ার সঙ্গে ‘ট্যাক্স’ আদায়ে চুক্তিবদ্ধ হয়ে চুক্তিপত্র সম্পাদন করেছেন। চুক্তিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে ‘১ম পক্ষ সোয়েব চৌধুরী ১৬ আনার মধ্যে ২য় পক্ষ সবুজ মিয়াকে ট্যাক্স আদায়ের স্বার্থে ও অন্যান্য সুবিধার জন্য ৮ আনা ভাগীদার করেছেন। এতে ১ম পক্ষের ও তাহার সঙ্গে যারা রয়েছে তাদের কোন অভিযোগ/আপত্তি নেই বা রইল না বলেও কথিত চুক্তিপত্রে উল্লেখ করা হয়।’ এদিকে আবুয়া-রঙ্গিয়ারচর নদীপথে চলাচলকারী নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের অভিযোগ,ট্যাক্সের নামেই আদায় করা চলছে চাঁদাবাজি। যতদিন যাচ্ছে ততই বেপরোয়া হয়ে উঠছে চাঁদাবাজ চক্র। চাঁদাবাজরা প্রতিদিন নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করে নদীতে চলাচলকারী নৌযান থেকে চাঁদা আদায় করছে। চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে নৌকায় থাকা মাঝি ও শ্রমিকদের ওপর চালানো হয় অত্যাচার-নির্যাতন। স্থানীয়রা জানান, দিন-রাত পালাক্রমে আবুয়া নদীর ফতেপুর পয়েন্ট থেকে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ের চাঁদা আদায়ের রশিদ ব্যবহার করে নৌযান শ্রমিক-মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এই চাঁদাবাজি ঘিরে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। ট্যাক্স আদায়ে নিয়োগপ্রাপ্ত কালেক্টর সুয়েব চৌধুরী জানান,৩ চেয়ারম্যান মিলে কাগজে স্বাক্ষর করে আমাকে কালেক্টর নিয়োগ করেছেন। আমি তাদেরকে মোটা অঙ্কের টাকা নগদে পরিশোধ করে ইজারা নিয়ে ট্যাক্স আদায় করে যাচ্ছি। আমাকে টাকা উঠানোর অনুমতি তারাই দিয়েছেন। আমি যদি অবৈধ হই তাহলে তারা সরকারের কাছে জবাবদিহী করবেন। কত টাকায় ইজারা হয়েছে কাগজে উল্লেখ না হলেও এটা আপনাকে পরে বলব। কথিত ট্যাক্স আদায়কারী গ্রুপের রুবেল মিয়া বলেন, কিভাবে চাঁদা আদায় করা হয় উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যানকে জিজ্ঞেস করতে পারেন না? তারাই বলবে। তিনি আরো জানান,উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ,উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সুলেমান তালুকদার,ফতেপুর ইউপি চেয়ারম্যান রনজিত চৌধুরী রাজন স্বাক্ষরিত একটি কাগজে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়েই আমারা টাকা উঠাচ্ছি।

অপরদিকে, ‘আরকাঠি’র নামে জসিম উদ্দিনের নেতৃত্বে আরেকটি গ্রুপ আবুয়া নদীর ভাটি থেকে চাঁদা আদায় করছে। এ বিষয়ে জসিম উদ্দিন বলেন, আমি কয়েকটি টাকা দিয়ে শেয়ার অইছি। এইডা সুনামগঞ্জ সদরের মনোয়ার হোসেন মনাই জানে। মনোয়ার হোসেন জানান, আরকাঠির বিষয়টি বৈধ। আরকাঠির কাগজ ডিসি-ইউএনও অফিসে আছে। ২০-২৫ টাকা করে ছেলেরা উঠায়। আমি এসব কাজে জড়িত নই। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে রঙ্গিয়ারচর এলাকা থেকে আরেকটি গ্রুপ বেপরোয়া চাঁদাবাজি কার্যক্রম চালাচ্ছে। কালেক্টর নিয়োগের মাধ্যমে নদীপথে ‘ট্যাক্স’ আদায়ের বিষয়ে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ বলেন, এ বিষয়টি সম্পর্কে ফতেপুর ইউপি চেয়ারম্যান বলতে পারবেন। ট্যাক্স আদায়ের জন্য কালেক্টর নিয়োগের কাগজে আমার স্বাক্ষর আছে বলে আমার খেয়াল নেই,দেখে বলতে হবে। চাঁদাবাজীর টাকা থেকে মাসিক কত টাকার ভাগ ভাটোয়ারা পান এমন প্রশ্নের কোন উত্তর দেননি তিনি। উপজেলা পরিষদের রিসিট ব্যবহার করে প্রায় চার মাস যাবৎ চাঁদা আদায় করা হচ্ছে, এ ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় আলোচনা করেছি। উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান সুলেমান তালুকদার বলেন, এইডা একটু বাদ দেওয়া যায় না?  হারুন ভাইরে (উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান) লইয়া একবার বইমুনে। ফতেপুর ইউপি চেয়ারম্যান রনজিত চৌধুরী রাজন বলেন, রঙ্গিয়ারচর-আবুয়া নদীতে ৩টি পয়েন্টে চাঁদাবাজি হচ্ছে। উপজেলা পরিষদের রশিদ দিয়ে একটি পয়েন্টে জসিম উদ্দিন, অন্য পয়েন্টে শাহ আলম ও রুবেল। ফতেপুর ইউপির রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য কত টাকা জমা হয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,এখন বলা যাবে না। অন্যদিকে আবুয়া ও রঙ্গিয়ারচর নৌপথে চাঁদাবাজি বন্ধে উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। তবে এখনো ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। বিশ্বম্ভরপুর থানার ওসি মুনির হোসেন মোল্লা বলেন, আমাদের পুলিশি টহল, নজরদারি রয়েছে। সাপ্তাহিক কিস্তিতে তিন পয়েন্ট থেকে থানাকে টাকা দেয়ার বিষয়টি সত্য নয়। অপরদিকে ফতেপুর ইউপির রঙ্গিয়ারচর ও আবুয়া নদীতে চাঁদাবাজি ও নৌযান শ্রমিক মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের উপর নির্যাতনের প্রতিবাদ জানিয়ে কয়েক দফা মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় চাঁদাবাজরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। গত চার মাসে এ নদীতে একটি ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা হয়নি। এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান তারা। ইউনিয়ন পরিষদের প্যাডে ৩ চেয়ারম্যান কর্তৃক ব্যাক্তিগতভাবে ট্যাক্স আদায়ের জন্য কাউকে ইজারাদার বা কালেক্টর নিয়োগ করার বিষয়টি নিছক বাড়াবাড়ি,বেআইনী ও এখতিয়ার বহির্ভূত বলে উল্লেখ করেছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক (ডিডিএলজি) ও সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিক মোঃ কামরুজ্জামান। তিনি বলেন,স্থানীয় সরকার বিভাগ বা জেলা প্রশাসনের অনুমোদন ব্যতিরেকে নদীপথে চলাচলকালে কোন নৌকার গতিরোধ করে আর্থিক সুবিধা নেয়াটাই হচ্ছে চাঁদাবাজী। আমরা চাঁদাবাজ যেই হউক তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো।

 

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterEmail this to someoneShare on LinkedIn