ওয়েছ খছরু-সিলেটে প্রেম ছিল মামুন ও হাবিবার। চার বছরের প্রেমের পরিণতি পায় গত ২৫শে সেপ্টেম্বর বিয়ের মাধ্যমে। পারিবারিকভাবেই তারা কাবিনের পর আক্‌দপর্বও শেষ করেন। কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো না হাবিবার। তার আগেই হাবিবার সঙ্গ ছেড়ে নতুন করে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে মামুন। এতে ক্ষুব্ধ হন হাবিবা। সিলেটের শাহপরাণ থানায় এ নিয়ে মামলা দায়ের করেন তিনি। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে হাবিবার ভাসুর সুজনকে।

মামুন ও হাবিবার বিয়ে, মামলা ও সুজন গ্রেপ্তার নিয়ে সিলেটে জল্পনা চলছে। তবে হাবিবার দাবি- মামুন প্রেমের অভিনয়ে তাকে ফাদে ফেলে বিয়ে করেছে। একাধিক নারীর সঙ্গে আগেও তার প্রেম-বিয়ে ছিল খবর এসেছে। বিয়ে করাই হচ্ছে মামুনের নেশা। ২০ বছর বয়সী হাবিবা আক্তারের বাড়ি শহরতলীর মেজরটিলা সৈয়দপুরে। মাকে নিয়ে সে ওখানে বসবাস করে। তাদের মূল বাড়ি গোলাপগঞ্জে। এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল সে। মামুনের পুরো নাম আব্দুল্লাহ আল মামুন। রোকন হচ্ছে তার ডাক নাম। মূল বাড়ি ছাতকের বনগাঁও গ্রামে। বর্তমানে তারা শহরতলীর বড়শালার পর্যটন মোটেল রোড এলাকার বাসিন্দা। সিলেট নগরীর আম্বরখানা হোটেল শেরাটন ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করছিল মামুন ও তার ভাই সুজন। হাবিবার মাসির বাড়ি হচ্ছে মামুনের গ্রামের বাড়ি ছাতকের বনগাঁওয়ের পাশে। মাসির বাড়ি যাওয়া-আসার সুবাদে প্রায় ৪ বছর আগে হাবিবার সঙ্গে পরিচয় হয় মামুনের। এরপর থেকে একে অপরের প্রেমে পড়ে যায়।

পরিবারের অজান্তে দু’জন নানা জায়গায় ঘোরাঘুরি ও ডেটিং করেছে। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে দুই পরিবারে তাদের প্রেমের বিষয়টি জানাজানি হলে মামুনের বড় ভাই সুজন মিয়া হাবিবার সঙ্গে বিয়ে দিতে উদ্যোগী হন। সেই হিসেবে তিনি হাবিবার বর্তমান অভিভাবক পিসতুত বোন রুজিনার বেগমের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু এই বিয়েতে রাজি হয়নি হাবিবার পরিবার। করোনার দোহাই দিয়ে তারা বিয়ের বিষয়টি পরে চিন্তা করবেন বলে জানিয়ে দেন। এর পরও নাছোড়বান্দা সুজন ও মামুন। তারা বিয়ের জন্য হাবিবা ও তার পরিবারকে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করে। প্রেমিকের সঙ্গে বিয়ে হতে রাজি ছিল হাবিবাও। পরে দুই বাড়ির সম্মতিক্রমে গত ২৫শে সেপ্টেম্বর বিয়ে হয় মামুন ও হাবিবার। হাবিবার মেজরটিলার বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে গিয়েই বিয়ে করেন মামুন। বিয়েতে ৪ লাখ টাকা কাবিন রাখা হয়। বিয়ে পড়ান সিলেট সিটি করপোরেশনের ২০নং ওয়ার্ডের কাজী সালাউদ্দিন কামাল। তিনি জানান, উভয় পরিবারের সম্মতিতে আত্মীয়-স্বজনের উপস্থিতিতে এই বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।

কাবিনে বর-কনে এবং আত্মীয়-স্বজনের দস্তখত রয়েছে। হাবিবা আক্তার গতকাল মানবজমিনকে জানিয়েছেন, কাবিন ও আকদ সম্পন্ন হওয়ার পর সাধারণত বর কনের বাড়িতে অবস্থান করে না। এবং বিয়ের পরপরই মামুন তাদের বাড়িতে চলে যায়। এবং সেখানে তারা স্বামী-স্ত্রীর মতো বসবাস করে। মামুন আম্বরখানাস্থ হোটেল শেরাটনে দিনে ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করতো। রাতে চলে যেতো হাবিবার কাছে। কথা ছিল সে কিছুদিনের মধ্যে উঠিয়ে নিয়ে যাবে তাদের বাড়িতে। কিন্তু তা না করে মামুন শ্বশুড়বাড়িতে যাতায়াত করে। কাবিন সম্পন্ন হওয়ার কারণে পরিবারের পক্ষ থেকে মামুনের বসবাসের ব্যাপারে কোনো আপত্তি তোলা হয়নি বলে জানান হাবিবা আক্তার। এদিকে বিয়ের কিছুদিন পর নানাভাবে টাকার জন্য চাপ প্রয়োগ করে মামুন। এমনকি টাকা না দেয়ায় হাবিবাকে সে একাধিক বার নির্যাতন করে। এসব ঘটনায় নিয়ে মামুন ও হাবিবার সংসারে তিক্ততার সৃষ্টি হয়। তবে- হাবিবা কিংবা তার পরিবার সেটি জটিল পর্যায়ে নেননি। এদিকে- মামুনের কথামতো হাবিবার বোন রোজিনা বেগম তাদেরকে ২ লাখ টাকার ফার্নিচার প্রদান করেন। হাবিবার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মামুনের চাহিদামতো আরো আড়াইলাখ টাকা নগদ প্রদান করেন। এতেও মন গলেনি মামুনের।

যৌতুকের আরো ৫ লাখ টাকার জন্য সে হাবিবাকে নির্যাতন করে। এদিকে গত ডিসেম্বরের হাবিবার পরিবারের পক্ষ থেকে শ্বশুড়বাড়িতে তুলে নিতে চাপ দেয়া হয়। এরপর থেকে বেঁকে বসে মামুন। হাবিবাকে তুলে নেবে, নিচ্ছে বলে কালক্ষেপণ করে। এক পর্যায়ে জানুয়ারির প্রথমার্ধ্ব থেকে সে গা-ঢাকা দেয়। হাবিবার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রাখলেও তার বাড়িতে আর যায়নি। এই অবস্থায় গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাবিবা জানতে পারে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের ছনবাড়ি এলাকায় মামুন বিয়ে করছে। বর সেজে বিয়ের আসরে বসা মামুনের ছবি তার বন্ধুরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করে। আর নিজের স্বামীর বিয়ের দৃশ্য দেখে ভেঙে পড়েন হাবিবা। বিষয়টি তিনি পরিবারকে জানান।

এদিকে বিয়ের খবর পেয়ে হাবিবার পরিবারের সদস্যরা মামুনের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তারা যোগাযোগ করতে পারেনি। শেষে গত শনিবার রাতে বোন রুজিনাসহ স্বজনরা মামুনের ভাই সুজনের বড়শালাস্থ বাসায় যান। সেখানে গিয়ে ডাকাডাকি করলেও দরোজা খোলেনি। পরে এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ এলে সুজন বাসার দরোজা খোলে। এবং ওখানে উপস্থিত থাকা হাবিবার কোনো স্বজনকে চিনেন না বলে জানিয়ে দেন। এ ঘটনার পর সজুনসহ কয়েকজন আত্মীয় ওই রাতেই মেজরটিলাস্থ বাসায় গিয়ে হাবিবাকে মারধর করেন। এ সময় তারা আরো একটি কাবিনে জোরপূর্বক দস্তখত নেয়ার চেষ্টা করে। এতে হাবিবা শোর-চিৎকার দিলে তারা চলে যায়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হন হাবিবা ও তার পরিবার। ফিরে আসার পর সিলেটের শাহপরাণ (রহ.) থানায় হাবিবা বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে গত শনিবার রাতে মামলা করেন।

মামলায় স্বামী আব্দুল্লাহ আল মামুন ছাড়াও ভাসুর সুজন আহমদ, স্বজন শাহনুর মিয়া ও আবুল কালামকে আসামি করেন। মামলা দায়েরের পর গত রোববার সকালে শাহপরাণ (রহ.) থানা পুলিশের একটি দল বড়শালা এলাকায় অভিযান চালিয়ে হাবিবার ভাসুর সুজন আহমদকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে সুজন আহমদ কারাগারে রয়েছে। তবে- হাবিবার স্বামী আব্দুল্লাহ আল মামুন পলাতক রয়েছে। তার সন্ধানে পুলিশ অভিযান চালালেও পায়নি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহপরাণ থানার এসআই চন্দ্র শেখর বড়ুয়া জানিয়েছেন, মামলার পর আসামি সুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর প্রধান আসামি মামুনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি। হাবিবার বড় বোন রুজিনা আক্তার জানিয়েছেন, মামুন ও তার পরিবার হাবিবার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তারা কাবিন করে বিয়ে এবং হাবিবার সঙ্গে ঘর-সংসারের বিষয়টিও অস্বীকার করছে।

তারা নানাভাবে প্রভাব দেখানোর চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, হাবিবার সঙ্গে প্রতারণা করে মালামালসহ সাড়ে ৪ লাখ টাকা নেয়ার পর ওই টাকা দিয়ে মামুন কোম্পানীগঞ্জের ছনবাড়ি এলাকার আরেক মেয়ের জীবন নষ্ট করেছে। মামুন একজন প্রতারক। সে বরিশালেও একইভাবে আরো একটি বিয়ে করেছে বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় বরিশালেও তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। এর পরও মামুন নিজেকে না শুধরে অসহায় মেয়েদের সঙ্গে বিয়ের নামে সর্বনাশ করছে।

এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterEmail this to someoneShare on LinkedIn