‘মানুষের প্রতি ছিল রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টুর অগাধ বিশ্বাস’
- সময় : ০২:২৯:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫
- / ২৮ ভিউ
প্রগতিশীল রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রপথিক, সুস্থ সমাজ বিনির্মাণের অবিচল সৈনিক, সমাজকর্মী রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু (৭৮) আর নেই। তিনি একাধারে কমরেড করুণ রায় স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক, সুনামগঞ্জ জেলা উদীচীর সহ-সভাপতি, জনউদ্যোগের আহ্বায়ক, সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য, হাওর বাঁচাও আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা ছিলেন।
বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শুক্রবার দুপুরে তাঁর মরদেহ শহরের জামাইপাড়া বাসায় নিয়ে আসা হয়। এসময় শহরের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ তাঁকে এক নজর দেখার জন্য ভিড় করেন। বিকালে শহরের ধোপাখালী শ্মশানে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সুনামগঞ্জ ভ্রমণ
এর আগে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রয়াত রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু’র মরদেহে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়। প্রথমে কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার দলীয় পতাকা মরদেহের উপর রেখে রেড স্যালুট প্রদান করেন। এছাড়া ফুলেল শ্রদ্ধা জানায় জেলা উদীচী, জনউদ্যোগ, খেলাঘর, হাওর বাঁচাও আন্দোলন, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, জেলা নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, রূপান্তর ও নদী রক্ষা আন্দোলন। এছাড়াও শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ।
এসময় ব্যাংকার মো. আশরাফ হোসেন লিটন বলেন, তাঁর (রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু) মৃত্যুতে সুনামগঞ্জ হারিয়েছে এক গুণীজন ও শান্ত স্বভাবের প্রিয় মানুষকে। তিনি ছিলেন ভদ্র, বিনয়ী স্বভাবের মানুষ। আমাদের জামাইপাড়ার মানুষের কাছে ছিলেন অভিভাবকস্বরূপ।
জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য ও প্রয়াত রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু’র সহপাঠি দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন বলেন, সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ে স্কুলজীবন থেকেই মিন্টু ছিলো অমায়িক ও উদার স্বভাবের। তাঁকে কখনও রাগান্বিত হতে দেখা যায়নি, মানুষের প্রতি তাঁর ছিল অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসা।
সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাড. হুমায়ুন মঞ্জুর চৌধুরী বলেন, ছাত্র ইউনিয়ন থেকে শুরু করে কমিউনিস্ট পার্টি পর্যন্ত প্রগতিশীল ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী রাজনীতিতে রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু’র ভূমিকা ছিলো অগ্রগণ্য। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তিনি ছিলেন শ্রদ্ধা ও অনুপ্রেরণার প্রতীক। রাতের আড্ডায় নুরানী হোটেল ছিল তাঁর অন্যতম মিলনস্থল। সাব্বির আহমদ মেনু, বিজন দাস, দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন সহ অনেকে সেখানে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডায় সময় কাটাতেন।
এদিকে প্রয়াত রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু’র মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সদস্য ও সাবেক সভাপতি অ্যাড হুমায়ুন মঞ্জুর চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য দেওয়ান শামসুল আবেদীন, জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন, সুনামগঞ্জ জেলা উদীচীর সভাপতি শীলা রায়, কবি ও লেখক সুখেন্দু সেন, অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা নৃপেশ তালুকদার নানু, জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান এমদাদ রেজা চৌধুরী, জেলা নাগরিক প্লাটফর্মের আহবায়ক সঞ্চিতা চৌধুরী, জেলা সিপিবির সাবেক সভাপতি চিত্তরঞ্জন তালুকদার, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি গৌরী ভট্টাচার্য্য, জেলা খেলাঘর আসরের সভাপতি বিজন সেন রায়, সুনামগঞ্জ পৌর কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শেরগুল আহমদ, হাওর বাঁচাও আন্দোলন সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি ইয়াকুব বখত বাহলুল, সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি পঙ্কজ দে, এনসিপি সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি দেওয়ান সাজাউর রাজা সুমন, সাবেক পৌর কাউন্সিলর অ্যাড. মনিষ কান্তি দে মিন্টু, আব্দুল্লাহ আল নোমান, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. খলিল রহমান, উদীচী কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি জাহাঙ্গীর আলম, ব্যাংকার মো. আশরাফ হোসেন লিটন, উদীচী সাধারণ সম্পাদক জহির উদ্দিন, হাওরের প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের যুগ্ম আহবায়ক ওবায়দুল ইসলাম মিলন ও রাজু আহমদ, জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি অ্যাড. বিমান কান্তি রায়, সাধারণ বিমল বনিক, জেলা যুব ইউনিয়নের সভাপতি আবু তাহের মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক মো. মাইনুদ্দীন, নাগরিক উদ্যোগ সুনামগঞ্জের সদস্য সচিব সাইদুর রহমান আসাদ, রূপান্তরের জেলা সমন্বয়কারী লাভলী সরকার লাবণ্য।
এছাড়াও রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু’র প্রয়াণে শোক প্রকাশ ও শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর ,সুনামগঞ্জ বার্তা (অনলাইন) পরিবার।
রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু ছাত্র জীবন থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। ‘রক্তাক্ত ৭১ সুনামগঞ্জ’ গ্রন্থে বজলুল মজিদ খসরু লিখেছেন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় স্থানীয়ভাবে ছাত্রদের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়াসকে সাধারণ মানুষর স্বাগত জানায়। লৌহমানব আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে লড়াকু ছাত্র সমাজের কৃতিত্ব মানুষ মূল্যায়ন করে অতি উচ্চমানে। সুনামগঞ্জ শহরে গোলাম রব্বানী, চৌধুরী মনসুর আহমদ কাজ করলেও পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে নতুন নেতৃবৃন্দের আবির্ভাব ঘটে। স্থানে স্থানে গড়ে ওঠে প্রতিরোধের জন্য দুর্নিবার ঘাঁটি। সুনামগঞ্জে ছাত্র সংগঠনের মধ্যে ছাত্র ইউনিয়নের মতিয়া গ্রুপের সমর্থক ছিল বেশি। এ দলের নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন গোলাম রব্বানী, আব্দুস শহীদ চৌধুরী (তাড়ল, দিরাই), সুদীপ্ত দাস (আজমিরিগঞ্জ), রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু (জামাইপাড়া), বনবীর রায় (দিরাই সদর), অজিত নাগ (পুরাতন বাস স্ট্যান্ড), হিমাদ্রী ভট্টাচার্য (হাছননগর) প্রমুখ।
অভ্যুত্থানে সুনামগঞ্জ কলেজের ছাত্ররা লাঠি-গুলি ও টিয়ার গ্যাসের মধ্যে রাজপথের নিশানাকে জীবনের উর্ধ্বে তোলেন। গঠিত হয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। কমিটিতে ছিলেন রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু, আব্দুস শহীদ চৌধুরী, সুদীপ্ত দাস (ছাত্র ইউনিয়ন, মতিয়া গ্রুপ) সহ অনেকে পাকবিরোধী বিদ্রোহী ভাব প্রকাশ করেন মিছিলে মিছিলে। গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্রদের স্পৃহা ছিল বর্ণনাতীত। কেননা সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যে একটি মাত্র কলেজ থাকা সত্ত্বেও হাইস্কুলের ছাত্ররাও অংশ নিয়েছিল।
সত্তর সালে সুনামগঞ্জ মহকুমায় শুধু সুনামগঞ্জ কলেজের অস্তিত্বই ছিল। এ কলেজকে ঘিরেই ছিল ছাত্র রাজনীতির প্রবাহ এবং ছিল দ্রোহ চেতনা লালনের সূতিকাগার। সুনামগঞ্জ কলেজে মূলত তিনটি ছাত্র সংগঠনের সক্রিয় কার্যক্রম ছিল। ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) ও ছাত্রলীগের সক্রিয় রাজনীতি থাকলেও শহরে কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব থাকায় স্বাভাবিক কারণে এখানে ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) গ্রুপের সমর্থক ছিল বেশি। একাত্তরের প্রথমদিকে আবারও ছাত্রনেতারা সামনে আসার সুযোগ পান এবং পুনরায় চূড়ান্তভাবে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে থাকেন। ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে সুনামগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সে অগ্নিদ্রোহী চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সে বছর ভি.পি নির্বাচিত হয়েছিলেন হুমায়ুন কবীর চৌধুরী (বড়পাড়া) এবং জি.এস জমিলুল হক চৌধুরী (কুলঞ্জ, দিরাই)।
শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের পর ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) ও ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয়ভাবে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করলেও সুনামগঞ্জে তখনো কোনো ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়নি। এ পর্যায়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে আবদুস শহীদ চৌধুরী, রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু, অজিতকুমার নাগ, বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু, এম. সাব্বির মিনু, হুমায়ুন কবীর চৌধুরী প্রমুখ এগিয়ে আসেন এবং স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে আন্দোলনকে বেগবান করেন। তারা নিজেদের কাঠের তৈরি ডামি রাইফেল নিয়ে ১ ও ২ মার্চ ট্রেনিং নেন এবং ৩ মার্চ ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) আলাদাভাবে মিছিল করে শহরে আগুনের ফুলকি তোলে।
ঐদিন স্বতস্ফূর্তভাবে সুনামগঞ্জ শহরে হরতাল পালিত হয়েছিল। ছাত্রদের বাধাহীন দুর্বার মিছিলের ওপর ছিল জনতার প্রত্যাশী দৃষ্টি। পরদিন ছাত্রনেতারা স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলনের দৃঢ় প্রত্যয়ে কাজ করেন। ৪ মার্চ ছাত্রলীগ ও ইউনিয়ন (মতিয়া) কর্মীরা যৌথভাবে প্রথমে পাকিস্তানি পতাকা পোড়ায় এবং মহকুমা প্রশাসকের অফিস ও থানার সম্মুখে ওড়ানো পতাকা বিনা বাধায় নামিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে দেন। পরে লঞ্চঘাটের পুলিশ ফাঁড়িতে পতাকা উত্তোলনের সময় সেখানে অবস্থানরত পুলিশরা গুলি করতে উদ্যত হলে শত শত ছাত্র ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকে। এ ঘটনা বিদ্যুৎবেগে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষ ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়ায়। এ সময় পুলিশ ফাঁড়িটি জনতার রোষানলে পড়ে। তখন আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন বখত এসে জনতাকে শান্ত করেন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক উত্তোলিত পতাকা ২৭ মার্চ পর্যন্ত সুনামগঞ্জ শহরে সগৌরবে উড়তে দেখা যায়। সুনামগঞ্জ মহকুমা শহরে যে সব ছাত্রনেতারা মুক্তিযুদ্ধকে বেগবান করতে প্রাথমিক পর্যায়ে তৃণমূলে কাজ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে আব্দুস শহীদ চৌধুরী, হুমায়ুন কবীর চৌধুরী, সাইফুর রহমান শামসু, রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু ছিলেন অন্যতম।
শুধু তাই নয়, স্বাধিকার আন্দোলনে জনগণকে সংগঠিত করতে গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সেলের আহবায়ক ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সুনামগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নজির হোসেন। চারজনের সেলের অন্যতম সদস্য ছিলেন রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু। আয়তনে ছোট হলেও তারা ন্যাপ, কৃষক সমিতি, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র ও ছাত্র ইউনিয়ন নেতৃত্বকে পরিচালনা ও আওয়ামী লীগের মধ্যেও তাদের গোপন ক্যাডারেরা কাজ করতো। ২৫ মার্চ আন্দোলনকারী জনবল দিয়ে পুলিশের অস্ত্র মজুতখানা ঘেরাও এর কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
নজির হোসেন ‘সুনামগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধ যেভাবে দেখেছি’ গ্রন্থে লিখেছেন, অস্ত্র মজুতখানার চারপাশে শত শত উত্তপ্ত জনতা। আসলে এই অভ্যুত্থানটি ছিল পরিকল্পিত। আমি ও হোসেন বখত সাব, রব্বানী ভাই ও মিন্টু উত্তপ্ত ছাত্র যুবকদের বুঝিয়ে তখনকার ওসি মুখলিসুর রহমানকে চাবি দিতে রাজী করিয়ে ৫০টি রাইফেল ও প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ সুশৃঙ্খলভাবে বের করে নিয়ে আসতে সক্ষম হই। পুলিশের এই অস্ত্র ভান্ডারে প্রায় ১০০০-১২০০ রাইফেল, বন্দুক গোলাবারুদ ছিল। অস্ত্র গোলাবারুদ লুঠ হয়ে যাওয়ার ভয় থেকেই আগে থেকেই এই পরিকল্পনা করা। আসলে সত্যিকার অর্থেই ক্ষমতসীন রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটা পরিকল্পিত অভ্যুত্থান ২৫ মার্চ বেলা ১১টার মধ্যে সুনামগঞ্জে সংগঠিত হয়। বাংলাদেশের আর কোথাও কি আন্দোলনকারী জনশক্তির পরিকল্পিত এই ধরনের অভ্যুত্থানের নজির আছে? এটা তো সুনামগঞ্জবাসীর গর্ব।
ঐদিন (২৫ মার্চ) সন্ধ্যা ৭টায় ওবায়দুর রেজা সাহেবের বাসায় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ নাম দিয়ে কমিটি গঠন করা হয়। ১৫ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ। আওয়ামী লীগ থেকে ১০ জন, ন্যাপ-সিপিবি থেকে ৪জন, স্বতন্ত্র ১ জন। এর সভাপতি ছিলেন হোসেন বখত এবং সেক্রেটারি ছিলেন আলফাত উদ্দিন। আমাকে (নজির হোসেন) করা হয় সহকারি সেক্রেটারি। অপর সদস্যরা হলেন দেওয়ান ওবাদুর রেজা, আবদুর রইছ, আবদুজহুর, খলিলুর রহমান চৌধুরী, আছদ্দর মোক্তার, আকমল আলী মুক্তার, সৈয়দ দিলওয়ার হোসেন, আলী ইউনুছ, গোলাম রব্বানী, আব্দুল বারী, আফাজউদ্দনি ও রমেন্দ্রে কুমার দে মিন্টু। ১৯৭১ সালের ১০ মে যখন আমরা শহর ছেড়ে চলে যাই তখন সংগ্রাম পরিষদের মাত্র তিনজন সদস্য শেষ পর্যন্ত টিকে ছিলাম। আছদ্দর সাব, আমি (নজির হোসেন) এবং আলফাত সাব।
প্রগতিশীল আন্দোলনের নিভৃতচারী ব্যক্তিত্বের প্রয়াণ
জাহাঙ্গীর আলম-সুনামগঞ্জ শহরের বহু আন্দোলন সংগ্রামের নিভৃতচারী এক পুরুষের নাম রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু। ভাটি অঞ্চলে জন্ম নেয়া এই মানুষটি শতভাগ প্রগতিশীল এবং মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বাস্তবায়নে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। আজ তাঁর প্রস্থানে সুনামগঞ্জের প্রগতিশীল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি হলো, যা অপূরণীয়।
সুনামগঞ্জ শহরের জামাইপাড়া বাসিন্দা প্রয়াত রসময় দে’র তিন ছেলে তিন মেয়ের মধ্যে রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু সবার বড়। মা সুনিতি বালা দে ছিলেন একজন প্রখ্যাত ধামাইল শিল্পী। সে কারণেই ভাই বোন সকলেই সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠেন। দুই বোন শুক্লা দে ও স্বপ্না দে দুইজন বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের এক সময় সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। আশির দশকে সুনামগঞ্জ শহরের এই দুই বোন ছাড়া সঙ্গীতানুষ্ঠান চিন্তা করা যেতো না। সঙ্গীত শিল্পী অভিজিৎ চৌধুরী, প্রয়াত দিগি¦জয় শর্মা চৌধুরী শিবু, দেওয়ান মহসিন রাজা চৌধুরী, শুক্লা দে ও স্বপ্না দে এই নামগুলো ছিলো সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অতিপরিচিত। সকলেই প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাথে যুক্ত ছিলেন।সুনামগঞ্জ ভ্রমণ
রমেন্দ্র কুমার দের জন্ম ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট। স্কুল জীবনে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নীল পতাকার ছায়তলে দীক্ষা নেন। বাবা রসরাজ দে বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকার সুবাধে সবসময় বাম নেতাদের আনাগোনা ছিলো বাসায়। পরবর্তীতে কমিউনিস্ট আদর্শের সাথে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ গ্রহণ করেন। প্রয়াত কমরেড প্রসূণ কান্তি বরুণ রায়, কমরেড নজির হোসেন সহ তৎকালিন নেতাদের সাথে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় ছিলেন। বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে তিনি সক্রিয় ছিলেন।
শিক্ষা জীবন শেষে তিনি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলায় জগদীশপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন। তাঁর সৎ ও সরল জীবন যাপনের জন্য অল্প সময়ে তিনি এলাকায় বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। সংসার জীবনে সফলতার জন্য সুদূর ইংল্যান্ড ফাড়ি জমান কিন্তু দেশের টানে বেশি দিন সেখানে থাকতে পারেন নি। পাঁচ বছর ইংল্যান্ডে থেকে দেশে ফিরে এলে
শান্তা রানী দে’র সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। দীর্ঘ সংসার জীবনে নিঃসন্তান থেকে যান এই দম্পতি। প্রায় আট দশ বছর পূর্বে স্ত্রী শান্তা রানীও তাঁকে একা করে না ফেরার দেশে চলে যান। পরবর্তীতে গ্রামীণ ডেন্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স অফিসে ব্যবস্থাপক হিসেবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেন।
প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলন, ক্ষেতমজুরের অধিকার আদায়ের আন্দোলন থেকে হাওরের মৎস্যজীবীদের ভাসানপানি আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন তিনি। তবে কখনো নিজে সংগঠনের কোন বড় পদ কিংবা পদবী গ্রহণ করেন নি। তিনি বলতেন, গণমানুষের পক্ষে কাজ করতে চাইলে পদের প্রয়োজন নেই। কোন বড় পদ না নিয়েও তিনিই সকল সংগঠনগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন।
২০০৯ সালে বাম রাজনীতির কিংবদন্তি নেতা কমরেড বরুণ রায় প্রয়াণের পর আমরা গড়ে তুলি কমরেড বরুণ রায় স্মৃতি সংসদ। মূলত এই সংগঠনের সর্বাত্মক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন লেখক-মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত অ্যাড. বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু এবং রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু। আমরা শুধু সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ণ করতাম মাত্র। উদীচীর ক্ষেত্রেও তিনিই হয়ে উঠেছিলেন ভরসার কেন্দ্রস্থল। সুনামগঞ্জের সমস্যা, সম্ভাবনা ভাবনায় নাগরিক উদ্যোগকে প্রায় একাই নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। তাঁর নেতৃত্বে অধিকাংশ সংগঠনেই আমার ছায়া সঙ্গী হিসেবে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে। প্রতিনিয়ত শিখেছি কিভাবে ধীর ও স্থির ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, বিপদের সময় কিভাবে শান্ত থেকে তা মোকাবিলা করতে হয়। তিনি ছিলেন কমরেড বরুণ রায় স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক, সুনামগঞ্জ জেলা উদীচীর সহসভাপতি, নাগরিক উদ্যোগ সুনামগঞ্জ এর আহবায়ক, নাগরিক প্লাটফর্মের অন্যতম নির্বাহী সদস্য, প্রগতি লেখক সংঘ সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সাবেক সভাপতি। এছাড়াও হাওর বাঁচাও আন্দোলন, বাংলাদেশ ট্রান্সপরেন্সি ইন্টারন্যশনাল (টিআইবি), খেলাঘর আসরসহ আরো বহু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।
আমরা হারিয়েছি সুনামগঞ্জের প্রগতিশীল আন্দোলনের এক নিভৃতচারী মানুষকে। আমি হারিয়েছি আমার অভিভাবকতুল্য এক মানুষকে। যার অভাব কখনো পূরণ হওয়ার নয়।
মিন্টু দা’র মতো বিনয়ী মানুষ বিরল
নৃপেশ তালুকদার নানু–শ্রদ্ধাভাজন রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু গত ২৭ নভেম্বর বৃহস্পতিবার রাত একটায় ঢাকাস্থ ইউনির্ভাসেল কলেজ ও হাসপাতালে ইহলোক ত্যাগ করে পরলোকগমন করেন। তিনি ছিলেন সাংস্কৃতিক পরিবারের সন্তান। পরিবারে ধামাইল গানের পাশাপাশি নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চা হতো। তাঁর প্রয়াত মাতা সুনিতি বালা দে ছিলেন জেলার প্রখ্যাত ধামাইল গানের শিল্পী। তাঁর ছোট বোন শুক্লা দে ও স্বপ্না দে রেডিও-টেলিভিশনে ধামাইল গান, লোকসংগীত নিয়মিত পরিবেশন করতেন। তাঁর ছোট কাকা সুরেন্দ্র কুমার দে ছিলেন সামাজিক ও রাজনৈতিক একজন ব্যক্তিত্ব। এক কথায় বলতে গেলে আমাদের সকলের প্রিয় মিন্টু দা সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আবহে বড় হয়েছেন। আমৃত্যু তিনি এই ধারা লালন ও ধারণ করে গেছেন।
মিন্টু দা কোনো পদ-পদবী ছাড়াই ছাত্র ইউনিয়নের সার্বক্ষণিক একজন কর্মী ছিলেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। তৎকালীন কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতা প্রয়াত নজির হোসেন, ধর্মপাশার ইসলাম উদ্দিন, দিরাইয়ের বনমালী রায় প্রমুখ মিন্টু দা’র বাসায় নিয়মিত আসা-যাওয়া করতেন।
গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রী লাভ করে তিনি জগন্নাথপুর উপজেলার জগদীশপুর উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। জগদীশপুর মূলত লন্ডন প্রবাসী এলাকা। সেখানকার দেশি-প্রবাসী লোকজন শিক্ষক মিন্টু দা’কে গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান করতেন। তাঁর অমায়িক ব্যবহার ও কর্মনিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে এক প্রবাসী শিক্ষানুরাগী তাঁকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন।
প্রায় পাঁচ বছর প্রবাস জীবন কাটিয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন। সেই সময় তার একজন রাজনৈতিক সহকর্মী মৌলভীবাজারের অপূর্ব চৌধুরীর পরামর্শে সুনামগঞ্জ গ্রামীণ ডেন্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স অফিসে ব্যবস্থাপক হিসেবে দীর্ঘ ৩০ বছর নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি এই শহরের প্রতিটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি সহযোগিতা করে গেছেন। ক্ষেত্রবিশেষে বিভিন্ন সংগঠনে তিনি নেতৃত্বও দিয়েছেন। মিন্টু দা ছিলেন একজন আপাদমস্তক ভালো মানুষ, তাঁর মতো নিরহংকারী ও বিনয়ী মানুষ আজকাল খুব বিরল।–সূত্র দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর














