০৯:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বিডিআর হত্যাকাণ্ডে আওয়ামী লীগ জড়িত, মূল সমন্বয়কারী তাপস

রিপোর্টার
  • সময় : ০৯:৩০:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫
  • / ৩৬ ভিউ

বিডিআর বিদ্রোহের নামে সংঘটিত বর্বরতম হত্যাযজ্ঞের বিষয় তদন্তের জন্য গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন প্রতিবেদন জমা দিয়েছে সরকারের কাছে। গতকাল অন্তর্বর্তী সরকারের  প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এই প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন। তদন্তে বিডিআর হত্যাকাণ্ডে বহিঃশক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সরাসরি জড়িত থাকার শক্তিশালী প্রমাণ মিলেছে বলে জানিয়েছে তদন্ত কমিশন। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

প্রেস উইং জানায়, কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ. ল. ম. ফজলুর রহমান ও অন্য সদস্যরা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে এই প্রতিবেদন জমা দেন।

কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন: মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার (অব.), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাইদুর রহমান বীরপ্রতীক (অব.), মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ যুগ্ম সচিব (অব.), ড. এম. আকবর আলী ডিআইজি (অব.), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন।

এ সময় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জাতি দীর্ঘদিন ধরে অন্ধকারে ছিল। আপনারা সত্য উদ্‌ঘাটনে যে ভূমিকা রেখেছেন জাতি তা স্মরণে রাখবে। জাতির পক্ষ থেকে আপনাদের প্রতি ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

তিনি বলেন, ইতিহাসের এই ভয়াবহতম ঘটনা নিয়ে জাতির অনেক প্রশ্ন ছিল, এই কাজের মধ্য দিয়ে সেসব প্রশ্নের অবসান ঘটবে। এই প্রতিবেদনে শিক্ষণীয় বহু বিষয় এসেছে। জাতির জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে এটি।কমিশন প্রধান ফজলুর রহমান বলেন, তদন্তকাজ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও ত্রুটিমুক্ত করার স্বার্থে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা যখন কাজ শুরু করি তখন ১৬ বছর আগের এই ঘটনার বহু আলামত ধ্বংস হয়ে গেছে। এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকে বিদেশে চলে গেছেন। কমিশন প্রধান বলেন, আমরা দুটো প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে গেছি। সাক্ষীদের ডাকলাম, কারও কারও ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বক্তব্য শুনেছি আমরা। যতক্ষণ তিনি বলতে চেয়েছেন। যারা তদন্তে জড়িত ছিল তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের তদন্তের রিপোর্ট কালেক্ট করেছি, অন্যান্য এলিমেন্ট কালেক্ট করেছি। তিনি আরও বলেন, এই তদন্তের মাধ্যমে বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে জনমনে থাকা প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে, উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা করা হয়েছে কার কী ভূমিকা ছিল। কেন সেনাবাহিনী দাঁড়িয়ে থাকলো অ্যাকশন নিলো না। ফজলুর রহমান বলেন, তদন্তে বিডিআর হত্যাকাণ্ডে বহিঃশক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সরাসরি জড়িত থাকার শক্তিশালী প্রমাণ মিলেছে। এসময় কমিশনের ফাইন্ডিংস সম্পর্কে জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার বলেন, এই ঘটনা কিছু বাহ্যিক ও প্রকৃত কারণ বের করেছে কমিশন।

তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত এবং এর পেছনে প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছিল তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের রক্ষা করতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। তারা ২০-২৫ জনের একটি মিছিল নিয়ে পিলখানায় ঢুকেছে এবং বের হওয়ার সময় সেই মিছিলে দুই শতাধিক মানুষ ছিল।

তিনি আরও বলেন, পুরো ঘটনাটি সংঘটিত করার ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছিল। তিনি এই ঘটনার দায় নিরূপণের ক্ষেত্রে বলেন, দায় তৎকালীন সরকার প্রধান থেকে শুরু করে সেনাপ্রধানেরও। এই ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পুলিশ ও র‍্যাব এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোরও রয়েছে চরম ব্যর্থতা। তিনি বলেন, ওই ঘটনার সময় কিছু প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং কয়েকজন সাংবাদিকের ভূমিকা ছিল অপেশাদার।

জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার বলেন, ওই হত্যাকাণ্ডের সময় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন) যেসব বিডিআর সদস্যদের সঙ্গে শেখ হাসিনা বৈঠক করেছে, তাদের সঠিক নাম-পরিচয় ও তথ্য সংরক্ষণ করা হয়নি। কমিশন তাদের প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ করে, যাতে করে ভবিষ্যতে বাহিনীগুলোতে এই ধরনের ঘটনা এড়ানো যায় এবং এই ঘটনার ভিকটিমরা ন্যায়বিচার পায়।

বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়ন বিষয়ক বিশেষ সহকারী অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আব্দুল হাফিজ ও স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনি। ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতেই ভারতের সহায়তায় পিলখানায় হত্যাকাণ্ড চালায় হাসিনা সরকার: কমিশন প্রধান

২০০৯ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহের নামে রাজধানীর পিলখানায় নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। এই হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন- সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ ফজলে নূর তাপস, শেখ সেলিম, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানক,  সাহারা খাতুন, জেনারেল তারেক, সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মঈন এবং সাবেক  ডিজিএফআই প্রধান জেনারেল আকবর। পিলখানা ট্র্যাজেডির দীর্ঘ তদন্তকাজ শেষে গতকাল প্রধান উপদেষ্টার কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর এক সংবাদ সম্মেলনে এমনটাই জানিয়েছেন ‘জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন’র সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ.ল.ম. ফজলুর রহমান। 

তিনি বলেন, দীর্ঘ তদন্ত শেষে বিডিআর বিদ্রোহের প্রকৃত কারণ, হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে ঠিক কারা জড়িত এবং এসব বিষয় থেকে পরিত্রাণ পেতে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশসহ আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কি করণীয় সে সম্পর্কে সুপারিশ করেছি আমরা। তিনি বলেন, আমাদের তদন্তে- বিডিআর বিদ্রোহে প্রতিবেশী দেশের সংশ্লিষ্টতা এবং সেনাবাহিনীকে দুর্বল করে হাসিনা সরকারের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখাসহ বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে। তদন্তের এই ১১ মাসে আমরা শত শত চিঠি লিখেছি শুধু তথ্যের জন্য। আমরা মোট ২৬৭ জন সাক্ষীর সঙ্গে কথা বলেছি। এর মধ্যে শহীদ পরিবারের সদস্য ১৪ জন, রাজনৈতিক ব্যক্তি ১০ জন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ২ জন, সামরিক কর্মকর্তা ১৩০ জন, অসামরিক কর্মকর্তা ৪ জন, পুলিশ কর্মকর্তা ২২ জন, বেসরকারি ব্যক্তিবর্গ ৯ জন, সাবেক ও বর্তমানে বিডিআর/বিজিবি সদস্য ২২ জন, কারাগারে আটক ২৬ জন, জাতিসংঘ সমন্বয়কারী, সাংবাদিকসহ যেখানে যাকে প্রয়োজন সকলের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা শেষ পর্যন্ত কেন বিডিআর হত্যাকাণ্ড হয়েছিল, কারা জড়িত, কেন সেনাবাহিনী সামরিক পদক্ষেপ নিলেন না, কেন পলিটিক্যাল ডিসিশন হলো এবং কীভাবে ষড়যন্ত্রের ডানা মেলেছিল, কারা এর সঙ্গে জড়িত সামরিক এবং বেসামরিক ব্যক্তিগণ সব জানতে পেরেছি। আমরা জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং মির্জা আজমের জবানবন্দিও অনলাইনে নিয়েছি।

তিনি বলেন, আমরা যখন তদন্ত শুরু করি তখন বুঝতে পারি, আমাদের সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বিডিআর মার্কেট, ডাল-ভাত কর্মসূচিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে তৎকালীন বিডিআর  সদস্যদের একটা টানাপড়েন চলছিল। সেনা নেতৃত্ব নিয়ে বিডিআরের সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। আর সেই সুযোগ নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, শেখ সেলিম, মির্জা আজম,  জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাহারা খাতুন, জেনারেল তারেক, সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মঈন এবং সাবেক ডিজিএফআই প্রধান জেনারেল আকবর এই বিডিআর বিদ্রোহ চালায়। আর এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত। তাদের ইন্ধনেই এই ঘটনা ঘটেছে। কারণ আমরা ভারত জড়িত থাকার অনেক আলামত পেয়েছি। সে সময় ভারত থেকে এই দেশে আসা মানুষের মধ্যে ৬৭ জনের তালিকা আমরা পাইনি। তারা কোন পথে দেশ ছেড়েছে তারও কোনো তথ্য কেউ দিতে পারেনি। শুধু বিডিআর নয় বিদ্রোহের দিনে পিলখানার মধ্যে যুবলীগ-ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিল। 

তিনি বলেন, পিলখানায় দরবার হল যেখানে ছিল সেখানে ম্যাক্সিমাম অফিসার নিহত হয়েছিলেন। আর সেখান থেকে ৩০-৪০ মিটারের মধ্যেই পাঁচ নম্বর গেট, সেখানে র‍্যাবের সদস্যরা সজ্জিত ছিল। কিন্তু তারা কোনো উদ্যোগ নেয়নি। আমরা জেনেছি- যখন এই ধরনের ঘটনা ঘটে তখন ওখানে নিয়োজিত হওয়ার ব্যাপারে র‍্যাবের কোনো আদেশের প্রয়োজন হয় না। পুলিশের ব্যাপারেও তাই। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, আসলে এই বিডিআর বিদ্রোহ এটা একদিনে হয়নি, দীর্ঘ সময় ধরে এগুলো হয়েছে। যেমন- তাপস এসে মসজিদে বসে মিটিং করেছেন, বিভিন্ন ট্রেনিং গ্রাউন্ডে বসে মিটিং হয়েছে অন্যান্য দেশের সঙ্গেও এখানে ওখানে জুমার নামাজ পড়ে তারপরে মিটিং হয়েছে। তারা অফিসে গেছে বিভিন্ন সময় একটা দীর্ঘ সময় ধরে কিন্তু এই ষড়যন্ত্রগুলো হয়েছে। সর্বশেষে গিয়ে এই কিলিংটা হয়েছে। আপনি ধরেন ২০০৯-এ এটা হয়েছে কিন্তু ২০০৮ এর নির্বাচনের পর থেকে এর পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। এই বিডিআর বিদ্রোহে বা হত্যাকাণ্ডে যারা সরকারকে সহায়তা করেছেন এদের মধ্যে সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে সুপারসিডেড হয়ে গেছেন এবং তার চাকরি থেকে চলে যাওয়ার কথা, কিন্তু তাকে প্রমোশন দিয়ে ডিজি বিডিআর করা হয়েছে এবং তার পরবর্তী পর্যায়ে সেনাপ্রধান করা হলো। তখন কেন সেনা অভিযান করা হয়নি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তৎকালীন  সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন সেনা সদর পরিত্যাগ করে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে চলে যান যমুনাতে এবং সেখানে তিনি সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ছিলেন। যেখানে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে কিলিং শুরু হয়েছে, লাশ বের হয়ে আসতেছে কিন্তু সেখান থেকে তিনি সেনা সদরে ফিরে আসেননি এবং আরও দুই বাহিনী প্রধান নৌ এবং বিমান বাহিনী উনিও সেখানে ছিলেন। জেনারেল মঈন তার বক্তব্যে আমাদেরকে বলেছেন- যে আমি যদি এখানে অ্যাকশন করতাম তাহলে ভারত বাংলাদেশে ইন্টারভেন করতো।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

বিডিআর হত্যাকাণ্ডে আওয়ামী লীগ জড়িত, মূল সমন্বয়কারী তাপস

সময় : ০৯:৩০:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫

বিডিআর বিদ্রোহের নামে সংঘটিত বর্বরতম হত্যাযজ্ঞের বিষয় তদন্তের জন্য গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন প্রতিবেদন জমা দিয়েছে সরকারের কাছে। গতকাল অন্তর্বর্তী সরকারের  প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এই প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন। তদন্তে বিডিআর হত্যাকাণ্ডে বহিঃশক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সরাসরি জড়িত থাকার শক্তিশালী প্রমাণ মিলেছে বলে জানিয়েছে তদন্ত কমিশন। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

প্রেস উইং জানায়, কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ. ল. ম. ফজলুর রহমান ও অন্য সদস্যরা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে এই প্রতিবেদন জমা দেন।

কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন: মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার (অব.), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাইদুর রহমান বীরপ্রতীক (অব.), মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ যুগ্ম সচিব (অব.), ড. এম. আকবর আলী ডিআইজি (অব.), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন।

এ সময় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জাতি দীর্ঘদিন ধরে অন্ধকারে ছিল। আপনারা সত্য উদ্‌ঘাটনে যে ভূমিকা রেখেছেন জাতি তা স্মরণে রাখবে। জাতির পক্ষ থেকে আপনাদের প্রতি ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

তিনি বলেন, ইতিহাসের এই ভয়াবহতম ঘটনা নিয়ে জাতির অনেক প্রশ্ন ছিল, এই কাজের মধ্য দিয়ে সেসব প্রশ্নের অবসান ঘটবে। এই প্রতিবেদনে শিক্ষণীয় বহু বিষয় এসেছে। জাতির জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে এটি।কমিশন প্রধান ফজলুর রহমান বলেন, তদন্তকাজ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও ত্রুটিমুক্ত করার স্বার্থে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা যখন কাজ শুরু করি তখন ১৬ বছর আগের এই ঘটনার বহু আলামত ধ্বংস হয়ে গেছে। এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকে বিদেশে চলে গেছেন। কমিশন প্রধান বলেন, আমরা দুটো প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে গেছি। সাক্ষীদের ডাকলাম, কারও কারও ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বক্তব্য শুনেছি আমরা। যতক্ষণ তিনি বলতে চেয়েছেন। যারা তদন্তে জড়িত ছিল তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের তদন্তের রিপোর্ট কালেক্ট করেছি, অন্যান্য এলিমেন্ট কালেক্ট করেছি। তিনি আরও বলেন, এই তদন্তের মাধ্যমে বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে জনমনে থাকা প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে, উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা করা হয়েছে কার কী ভূমিকা ছিল। কেন সেনাবাহিনী দাঁড়িয়ে থাকলো অ্যাকশন নিলো না। ফজলুর রহমান বলেন, তদন্তে বিডিআর হত্যাকাণ্ডে বহিঃশক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সরাসরি জড়িত থাকার শক্তিশালী প্রমাণ মিলেছে। এসময় কমিশনের ফাইন্ডিংস সম্পর্কে জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার বলেন, এই ঘটনা কিছু বাহ্যিক ও প্রকৃত কারণ বের করেছে কমিশন।

তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত এবং এর পেছনে প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছিল তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের রক্ষা করতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। তারা ২০-২৫ জনের একটি মিছিল নিয়ে পিলখানায় ঢুকেছে এবং বের হওয়ার সময় সেই মিছিলে দুই শতাধিক মানুষ ছিল।

তিনি আরও বলেন, পুরো ঘটনাটি সংঘটিত করার ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছিল। তিনি এই ঘটনার দায় নিরূপণের ক্ষেত্রে বলেন, দায় তৎকালীন সরকার প্রধান থেকে শুরু করে সেনাপ্রধানেরও। এই ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পুলিশ ও র‍্যাব এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোরও রয়েছে চরম ব্যর্থতা। তিনি বলেন, ওই ঘটনার সময় কিছু প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং কয়েকজন সাংবাদিকের ভূমিকা ছিল অপেশাদার।

জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার বলেন, ওই হত্যাকাণ্ডের সময় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন) যেসব বিডিআর সদস্যদের সঙ্গে শেখ হাসিনা বৈঠক করেছে, তাদের সঠিক নাম-পরিচয় ও তথ্য সংরক্ষণ করা হয়নি। কমিশন তাদের প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ করে, যাতে করে ভবিষ্যতে বাহিনীগুলোতে এই ধরনের ঘটনা এড়ানো যায় এবং এই ঘটনার ভিকটিমরা ন্যায়বিচার পায়।

বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়ন বিষয়ক বিশেষ সহকারী অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আব্দুল হাফিজ ও স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনি। ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতেই ভারতের সহায়তায় পিলখানায় হত্যাকাণ্ড চালায় হাসিনা সরকার: কমিশন প্রধান

২০০৯ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহের নামে রাজধানীর পিলখানায় নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। এই হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন- সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ ফজলে নূর তাপস, শেখ সেলিম, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানক,  সাহারা খাতুন, জেনারেল তারেক, সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মঈন এবং সাবেক  ডিজিএফআই প্রধান জেনারেল আকবর। পিলখানা ট্র্যাজেডির দীর্ঘ তদন্তকাজ শেষে গতকাল প্রধান উপদেষ্টার কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর এক সংবাদ সম্মেলনে এমনটাই জানিয়েছেন ‘জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন’র সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ.ল.ম. ফজলুর রহমান। 

তিনি বলেন, দীর্ঘ তদন্ত শেষে বিডিআর বিদ্রোহের প্রকৃত কারণ, হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে ঠিক কারা জড়িত এবং এসব বিষয় থেকে পরিত্রাণ পেতে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশসহ আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কি করণীয় সে সম্পর্কে সুপারিশ করেছি আমরা। তিনি বলেন, আমাদের তদন্তে- বিডিআর বিদ্রোহে প্রতিবেশী দেশের সংশ্লিষ্টতা এবং সেনাবাহিনীকে দুর্বল করে হাসিনা সরকারের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখাসহ বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে। তদন্তের এই ১১ মাসে আমরা শত শত চিঠি লিখেছি শুধু তথ্যের জন্য। আমরা মোট ২৬৭ জন সাক্ষীর সঙ্গে কথা বলেছি। এর মধ্যে শহীদ পরিবারের সদস্য ১৪ জন, রাজনৈতিক ব্যক্তি ১০ জন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ২ জন, সামরিক কর্মকর্তা ১৩০ জন, অসামরিক কর্মকর্তা ৪ জন, পুলিশ কর্মকর্তা ২২ জন, বেসরকারি ব্যক্তিবর্গ ৯ জন, সাবেক ও বর্তমানে বিডিআর/বিজিবি সদস্য ২২ জন, কারাগারে আটক ২৬ জন, জাতিসংঘ সমন্বয়কারী, সাংবাদিকসহ যেখানে যাকে প্রয়োজন সকলের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা শেষ পর্যন্ত কেন বিডিআর হত্যাকাণ্ড হয়েছিল, কারা জড়িত, কেন সেনাবাহিনী সামরিক পদক্ষেপ নিলেন না, কেন পলিটিক্যাল ডিসিশন হলো এবং কীভাবে ষড়যন্ত্রের ডানা মেলেছিল, কারা এর সঙ্গে জড়িত সামরিক এবং বেসামরিক ব্যক্তিগণ সব জানতে পেরেছি। আমরা জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং মির্জা আজমের জবানবন্দিও অনলাইনে নিয়েছি।

তিনি বলেন, আমরা যখন তদন্ত শুরু করি তখন বুঝতে পারি, আমাদের সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বিডিআর মার্কেট, ডাল-ভাত কর্মসূচিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে তৎকালীন বিডিআর  সদস্যদের একটা টানাপড়েন চলছিল। সেনা নেতৃত্ব নিয়ে বিডিআরের সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। আর সেই সুযোগ নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, শেখ সেলিম, মির্জা আজম,  জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাহারা খাতুন, জেনারেল তারেক, সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মঈন এবং সাবেক ডিজিএফআই প্রধান জেনারেল আকবর এই বিডিআর বিদ্রোহ চালায়। আর এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত। তাদের ইন্ধনেই এই ঘটনা ঘটেছে। কারণ আমরা ভারত জড়িত থাকার অনেক আলামত পেয়েছি। সে সময় ভারত থেকে এই দেশে আসা মানুষের মধ্যে ৬৭ জনের তালিকা আমরা পাইনি। তারা কোন পথে দেশ ছেড়েছে তারও কোনো তথ্য কেউ দিতে পারেনি। শুধু বিডিআর নয় বিদ্রোহের দিনে পিলখানার মধ্যে যুবলীগ-ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিল। 

তিনি বলেন, পিলখানায় দরবার হল যেখানে ছিল সেখানে ম্যাক্সিমাম অফিসার নিহত হয়েছিলেন। আর সেখান থেকে ৩০-৪০ মিটারের মধ্যেই পাঁচ নম্বর গেট, সেখানে র‍্যাবের সদস্যরা সজ্জিত ছিল। কিন্তু তারা কোনো উদ্যোগ নেয়নি। আমরা জেনেছি- যখন এই ধরনের ঘটনা ঘটে তখন ওখানে নিয়োজিত হওয়ার ব্যাপারে র‍্যাবের কোনো আদেশের প্রয়োজন হয় না। পুলিশের ব্যাপারেও তাই। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, আসলে এই বিডিআর বিদ্রোহ এটা একদিনে হয়নি, দীর্ঘ সময় ধরে এগুলো হয়েছে। যেমন- তাপস এসে মসজিদে বসে মিটিং করেছেন, বিভিন্ন ট্রেনিং গ্রাউন্ডে বসে মিটিং হয়েছে অন্যান্য দেশের সঙ্গেও এখানে ওখানে জুমার নামাজ পড়ে তারপরে মিটিং হয়েছে। তারা অফিসে গেছে বিভিন্ন সময় একটা দীর্ঘ সময় ধরে কিন্তু এই ষড়যন্ত্রগুলো হয়েছে। সর্বশেষে গিয়ে এই কিলিংটা হয়েছে। আপনি ধরেন ২০০৯-এ এটা হয়েছে কিন্তু ২০০৮ এর নির্বাচনের পর থেকে এর পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। এই বিডিআর বিদ্রোহে বা হত্যাকাণ্ডে যারা সরকারকে সহায়তা করেছেন এদের মধ্যে সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে সুপারসিডেড হয়ে গেছেন এবং তার চাকরি থেকে চলে যাওয়ার কথা, কিন্তু তাকে প্রমোশন দিয়ে ডিজি বিডিআর করা হয়েছে এবং তার পরবর্তী পর্যায়ে সেনাপ্রধান করা হলো। তখন কেন সেনা অভিযান করা হয়নি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তৎকালীন  সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন সেনা সদর পরিত্যাগ করে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে চলে যান যমুনাতে এবং সেখানে তিনি সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ছিলেন। যেখানে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে কিলিং শুরু হয়েছে, লাশ বের হয়ে আসতেছে কিন্তু সেখান থেকে তিনি সেনা সদরে ফিরে আসেননি এবং আরও দুই বাহিনী প্রধান নৌ এবং বিমান বাহিনী উনিও সেখানে ছিলেন। জেনারেল মঈন তার বক্তব্যে আমাদেরকে বলেছেন- যে আমি যদি এখানে অ্যাকশন করতাম তাহলে ভারত বাংলাদেশে ইন্টারভেন করতো।