০২:২৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যে ভাবে বেড়িয়ে এলো সাইকো সম্রাটের শিকার তানিয়ার নাম-পরিচয়

রিপোর্টার
  • সময় : ১২:৪৭:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ১৩৭ ভিউ

সোহেল রানা-পরিত্যক্ত একটি ভবনের নীরবতা অনেক কিছু ঢেকে রাখে। সেখানে আলো কম, শব্দ কম-কিন্তু গল্প থাকে ভীষণ ভারী। ১৮ই জানুয়ারি সাভার পৌর এলাকার পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টারের দ্বিতীয় তলা থেকে যখন পুলিশ দু’টি পোড়ানো মরদেহ উদ্ধার করে তখনো কেউ জানতো না-এই নিথর দেহ দু’টির একটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা। এক মায়ের বুকভরা উৎকণ্ঠা আর একটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের দায়।

সাভার মডেল থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সুরতহাল সম্পন্ন করে। তখন মরদেহটি ছিল পরিচয়হীন। কিন্তু পুলিশের কাছে সেটি কেবল একটি অজ্ঞাত লাশ ছিল না-এটি ছিল একটি জীবনের শেষ প্রশ্নচিহ্ন। সুরতহাল শেষে থানার এসআই মো. শাখাওয়াত ইমতিয়াজ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেন এবং মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় এসআই মো. ফাইজুর খানকে। মামলার আগে তদন্ত শুরু হয় নীরবে, ধৈর্যের সঙ্গে, আলামতের ভাষা পড়ে। তদন্তের একপর্যায়ে উদ্ধার হয় একটি সিসিটিভি ফুটেজ। সেখানে দেখা যায়, সাইকো সম্রাট ওরফে সবুজ শেখ নিজ কাঁধে করে এক নারীর নিথর দেহ নিয়ে যাচ্ছেন দ্বিতীয় তলায়। আগুনে পোড়ানোর প্রস্তুতির সেই দৃশ্য শুধু অপরাধের প্রমাণ নয়, বরং মানবতার বিপর্যয়ের এক নিঃশব্দ দলিল। পুলিশ সময় নষ্ট করেনি। পুলিশ সদস্য মনির হোসেনের সহায়তায় সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) মো. হেলাল উদ্দিনের নেতৃত্বে অভিযুক্ত সম্রাটকে মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সে নিজ মুখে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে। পরদিন, ১৯শে জানুয়ারি, বিজ্ঞ আদালতে হাজির করা হলে সে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তানিয়াসহ ৬টি হত্যার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। আদালত তার জবানবন্দি গ্রহণ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

কিন্তু তখনো সেই নারীর নাম জানা যায়নি। অচেনা পরিচয়ের এই শূন্যতার মধ্যেই সত্যের আরেকটি দরজা খুলে যায়। ঘটনার দুই দিন আগে, ১৬ই জানুয়ারি গভীর রাতে, প্রতিবেদক সাভার কমিউনিটি সেন্টারে একটি ভিডিও ধারণ করেন। সেই ভিডিওতে তানিয়া আক্তার ও অভিযুক্ত সম্রাট ওরফে সবুজ শেখকে একসঙ্গে দেখা যায়। ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি যখন মানুষের মোবাইল স্ক্রিনে ঘুরছিল, তখন উত্তরখানের একটি ভাড়া বাসায় বসে একজন মা থমকে যান। তিনি চিনে ফেলেন তার হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে। এই মায়ের নাম জুলেখা বেগম। তিনি মেয়ে হারানোর ১৭ দিন পর ১৮ই জানুয়ারি, উত্তরখান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। সেখানে লেখা ছিল-তার মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়ে তানিয়া আক্তার (২৬) গত ১লা জানুয়ারি সকাল আনুমানিক ১১টায় বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেনি। সেই জিডি ছিল একজন মায়ের অপেক্ষার লিখিত দলিল।

সাংবাদিকের ভিডিও সেই অপেক্ষার সঙ্গে বাস্তবতাকে মিলিয়ে দেয়। ভিডিও দেখে নিশ্চিত হয়ে ১৯শে জানুয়ারি রাত ১১টায় তানিয়ার পরিবার সাভার মডেল থানায় আসে। সেখান থেকে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে। পোড়ানো মরদেহের মুখমণ্ডল পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত না থাকায় এবং শরীরের জন্মদাগ দেখে পরিবার নিশ্চিত হয়-এটি তাদেরই তানিয়া। পরদিন, তানিয়ার ভাই সোহেল মিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে লাশ গ্রহণের আবেদন করেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আরমান আলী মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. ফাইজুর খানকে মরদেহ হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০শে জানুয়ারি বিকাল সাড়ে তিনটায় পুলিশ মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।

উত্তরখানের বড়বাগ জামে মসজিদে জানাজা শেষে ২০শে জানুয়ারি রাত ৯টায় তানিয়াকে দাফন করা হয় দক্ষিণখান থানার আজিমপুর গণকবরস্থানে, তার বাবা জসিম উদ্দীনের কবরের পাশে। বাবার পাশে মেয়ের চিরনিদ্রা-এই দৃশ্য অনেককেই নীরব করে দেয়। তানিয়ারা ৫ বোন এক ভাই। তানিয়া ছিল তৃতীয়। গ্রামের বাড়ি ভোলা জেলায় হলেও জীবনের বাস্তবতায় তারা নানার বাড়ি ঢাকায় পার্শ্ববর্তী ভাড়া বাসায় থাকতেন। একটি সাধারণ পরিবার, সাধারণ জীবন-যার শেষটা এমন হওয়ার কথা ছিল না। তানিয়ার বোন নাসরিন আক্তার ফারিয়া বলেন, সাংবাদিকের ভিডিও এবং পুলিশের পেশাদার তদন্ত না হলে হয়তো তারা কখনোই জানতে পারতেন না তাদের বোনের শেষ পরিণতি কী হয়েছে। অন্তত পরিচয়সহ দাফন করার সুযোগ পেয়েছেন-এটুকুই তাদের জন্য বড় স্বস্তি।

এ ব্যাপারে সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ আরমান আলী জানান, সাংবাদিকের ভিডিও, পোশাক ও জন্মদাগসহ সব আলামতের ভিত্তিতে পরিবার তানিয়াকে শনাক্ত করেছে এবং আইন অনুযায়ী মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের গল্প কাউকে চমকে দেয়ার জন্য নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়ার জন্য-সত্য চাপা পড়ে থাকলেও হারিয়ে যায় না। একটি ক্যামেরা, একটি নিখোঁজ ডায়েরি আর পুলিশের নিষ্ঠা একসঙ্গে থাকলে অপরাধ অন্ধকারে লুকিয়ে থাকতে পারে না। তানিয়া আক্তার আর নেই। কিন্তু তার নাম হারায়নি। এখন রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশা একটাই-এই হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার। কারণ ন্যায়বিচার শুধু শাস্তি নয়, এটি জীবিতদের জন্য একটুখানি স্বস্তির নিঃশ্বাস।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

যে ভাবে বেড়িয়ে এলো সাইকো সম্রাটের শিকার তানিয়ার নাম-পরিচয়

সময় : ১২:৪৭:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬

সোহেল রানা-পরিত্যক্ত একটি ভবনের নীরবতা অনেক কিছু ঢেকে রাখে। সেখানে আলো কম, শব্দ কম-কিন্তু গল্প থাকে ভীষণ ভারী। ১৮ই জানুয়ারি সাভার পৌর এলাকার পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টারের দ্বিতীয় তলা থেকে যখন পুলিশ দু’টি পোড়ানো মরদেহ উদ্ধার করে তখনো কেউ জানতো না-এই নিথর দেহ দু’টির একটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা। এক মায়ের বুকভরা উৎকণ্ঠা আর একটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের দায়।

সাভার মডেল থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সুরতহাল সম্পন্ন করে। তখন মরদেহটি ছিল পরিচয়হীন। কিন্তু পুলিশের কাছে সেটি কেবল একটি অজ্ঞাত লাশ ছিল না-এটি ছিল একটি জীবনের শেষ প্রশ্নচিহ্ন। সুরতহাল শেষে থানার এসআই মো. শাখাওয়াত ইমতিয়াজ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেন এবং মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় এসআই মো. ফাইজুর খানকে। মামলার আগে তদন্ত শুরু হয় নীরবে, ধৈর্যের সঙ্গে, আলামতের ভাষা পড়ে। তদন্তের একপর্যায়ে উদ্ধার হয় একটি সিসিটিভি ফুটেজ। সেখানে দেখা যায়, সাইকো সম্রাট ওরফে সবুজ শেখ নিজ কাঁধে করে এক নারীর নিথর দেহ নিয়ে যাচ্ছেন দ্বিতীয় তলায়। আগুনে পোড়ানোর প্রস্তুতির সেই দৃশ্য শুধু অপরাধের প্রমাণ নয়, বরং মানবতার বিপর্যয়ের এক নিঃশব্দ দলিল। পুলিশ সময় নষ্ট করেনি। পুলিশ সদস্য মনির হোসেনের সহায়তায় সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) মো. হেলাল উদ্দিনের নেতৃত্বে অভিযুক্ত সম্রাটকে মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সে নিজ মুখে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে। পরদিন, ১৯শে জানুয়ারি, বিজ্ঞ আদালতে হাজির করা হলে সে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তানিয়াসহ ৬টি হত্যার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। আদালত তার জবানবন্দি গ্রহণ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

কিন্তু তখনো সেই নারীর নাম জানা যায়নি। অচেনা পরিচয়ের এই শূন্যতার মধ্যেই সত্যের আরেকটি দরজা খুলে যায়। ঘটনার দুই দিন আগে, ১৬ই জানুয়ারি গভীর রাতে, প্রতিবেদক সাভার কমিউনিটি সেন্টারে একটি ভিডিও ধারণ করেন। সেই ভিডিওতে তানিয়া আক্তার ও অভিযুক্ত সম্রাট ওরফে সবুজ শেখকে একসঙ্গে দেখা যায়। ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি যখন মানুষের মোবাইল স্ক্রিনে ঘুরছিল, তখন উত্তরখানের একটি ভাড়া বাসায় বসে একজন মা থমকে যান। তিনি চিনে ফেলেন তার হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে। এই মায়ের নাম জুলেখা বেগম। তিনি মেয়ে হারানোর ১৭ দিন পর ১৮ই জানুয়ারি, উত্তরখান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। সেখানে লেখা ছিল-তার মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়ে তানিয়া আক্তার (২৬) গত ১লা জানুয়ারি সকাল আনুমানিক ১১টায় বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেনি। সেই জিডি ছিল একজন মায়ের অপেক্ষার লিখিত দলিল।

সাংবাদিকের ভিডিও সেই অপেক্ষার সঙ্গে বাস্তবতাকে মিলিয়ে দেয়। ভিডিও দেখে নিশ্চিত হয়ে ১৯শে জানুয়ারি রাত ১১টায় তানিয়ার পরিবার সাভার মডেল থানায় আসে। সেখান থেকে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে। পোড়ানো মরদেহের মুখমণ্ডল পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত না থাকায় এবং শরীরের জন্মদাগ দেখে পরিবার নিশ্চিত হয়-এটি তাদেরই তানিয়া। পরদিন, তানিয়ার ভাই সোহেল মিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে লাশ গ্রহণের আবেদন করেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আরমান আলী মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. ফাইজুর খানকে মরদেহ হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০শে জানুয়ারি বিকাল সাড়ে তিনটায় পুলিশ মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।

উত্তরখানের বড়বাগ জামে মসজিদে জানাজা শেষে ২০শে জানুয়ারি রাত ৯টায় তানিয়াকে দাফন করা হয় দক্ষিণখান থানার আজিমপুর গণকবরস্থানে, তার বাবা জসিম উদ্দীনের কবরের পাশে। বাবার পাশে মেয়ের চিরনিদ্রা-এই দৃশ্য অনেককেই নীরব করে দেয়। তানিয়ারা ৫ বোন এক ভাই। তানিয়া ছিল তৃতীয়। গ্রামের বাড়ি ভোলা জেলায় হলেও জীবনের বাস্তবতায় তারা নানার বাড়ি ঢাকায় পার্শ্ববর্তী ভাড়া বাসায় থাকতেন। একটি সাধারণ পরিবার, সাধারণ জীবন-যার শেষটা এমন হওয়ার কথা ছিল না। তানিয়ার বোন নাসরিন আক্তার ফারিয়া বলেন, সাংবাদিকের ভিডিও এবং পুলিশের পেশাদার তদন্ত না হলে হয়তো তারা কখনোই জানতে পারতেন না তাদের বোনের শেষ পরিণতি কী হয়েছে। অন্তত পরিচয়সহ দাফন করার সুযোগ পেয়েছেন-এটুকুই তাদের জন্য বড় স্বস্তি।

এ ব্যাপারে সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ আরমান আলী জানান, সাংবাদিকের ভিডিও, পোশাক ও জন্মদাগসহ সব আলামতের ভিত্তিতে পরিবার তানিয়াকে শনাক্ত করেছে এবং আইন অনুযায়ী মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের গল্প কাউকে চমকে দেয়ার জন্য নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়ার জন্য-সত্য চাপা পড়ে থাকলেও হারিয়ে যায় না। একটি ক্যামেরা, একটি নিখোঁজ ডায়েরি আর পুলিশের নিষ্ঠা একসঙ্গে থাকলে অপরাধ অন্ধকারে লুকিয়ে থাকতে পারে না। তানিয়া আক্তার আর নেই। কিন্তু তার নাম হারায়নি। এখন রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশা একটাই-এই হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার। কারণ ন্যায়বিচার শুধু শাস্তি নয়, এটি জীবিতদের জন্য একটুখানি স্বস্তির নিঃশ্বাস।