শূন্য বনে’র শিয়াল রাজা’র বাঘের বীরত্ব দেখানো সাজেনা
- সময় : ১২:২০:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ১৪৭ ভিউ
তারেক রহমানের সতেরো বছর পর প্রত্যাবর্তন এবং তাকে দেওয়া রাজকীয় সংবর্ধনা, যাকে অনেকেই শেখ হাসিনার ষোলো বছর পর বিদেশে আশ্রয়ের বিপরীতে সমান্তরাল ও প্রতিশোধমূলক বিজয় হিসাবে উপস্থাপন করতে চাইছে, তা মূলত একটি গভীর ভণ্ডামি ও রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার প্রকাশ।
এই সমীকরণটি কৃত্রিম এবং বিপজ্জনকভাবে সরলীকৃত। একটি হলো দীর্ঘ স্বেচ্ছা নির্বাসন শেষে ফেরার ঘটনা, অন্যটি হলো দীর্ঘ ক্ষমতার পর পরিস্থিতি জনিত প্রস্থান। এ দুটি ঘটনা প্রকৃতিতে, প্রেক্ষাপটে ও রাজনৈতিক তাৎপর্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের একই পাল্লায় তোলার চেষ্টা শুধু ভুলই নয়, জনমনে একটি বিভ্রান্তিকর ও বিভেদমূলক আবেগ তৈরি করা।
এই ‘উৎসব’ আসলে হাসিনাকে অপমান বা তাকে দেশে না আসতে দেওয়াকে চিরস্থায়ী করার একটি ক্ষণিক ও শিশুসুলভ প্রচেষ্টা মাত্র। এতে সাময়িক মানসিক তৃপ্তি মিললেও রাজনৈতিক বাস্তবতা এর থেকে সম্পূর্ণ পৃথক।
ক্ষমতার রূপান্তর কখনোই ব্যক্তিগত পরাজয়ের উল্লাস দিয়ে টেকসই হয় না, বরং তা নির্ভর করে প্রতিষ্ঠান, নীতি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উপর। এই বিভ্রান্তি ইচ্ছাকৃত; কারণ এতে তারেকের ফেরার নিজস্ব দুর্বলতাগুলো দীর্ঘ অনুপস্থিতি, প্রত্যক্ষ সংগ্রামের অভাব, সময়োপযোগী সাহসের পরিচয় না দেওয়া সব প্রকাশ হয়ে যায়।
বাস্তবতা হলো, রাজনীতির আসল মূল্যায়ন হয় ঝুঁকি ও সংকটের মুহূর্তে, না যে শূন্যতা তৈরি হয় সেই শূন্যস্থান দখলের সুবিধাবাদী সুযোগে।
তারেক রহমানের সাহস হয়নি এই সতেরো বছরে একবারও দেশে ফেরার। এই সাহস শব্দটা অলংকার নয়, রাজনীতির মেরুদণ্ড। যে রাজনীতি সাহস ছাড়া চলে, তা কেবল স্মৃতিকাতরতা আর পোস্টার-নির্ভর আবেগে টিকে থাকে। যে বনে বাঘ কিছুদিনের জন্য বা চিরদিনের জন্য সরে যায়, সেই বনে শিয়াল যদি নিজেকে বাঘ বলে ঘোষণা করে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
ঘোষণা দিতে সাহস লাগে না, টিকে থাকতে লাগে। কিন্তু শিয়াল যতই গর্জাক, তার ভয় যায় না; কারণ সে জানে বাঘ ফিরলে হিসাব পাল্টে যাবে।
শেখ হাসিনা দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্রে সরে গেছেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এটাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে তিনি ষোলো বছর দাপটের সাথে বাংলাদেশ শাসন করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে বহু শিয়াল নানা হুংকার দিয়েছে, নানা বক্তৃতায় বুক ফুলিয়েছে, কিন্তু বাঘ তখনও দাঁড়িয়েই ছিল। হুংকার আর ক্ষমতা এক জিনিস নয়।
আজ যে ভাবে তারেককে বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে, সেটি সত্যিকারের সংবর্ধনা হতো যদি তিনি হাসিনার শাসনামলেই দেশে ফেরার সাহস দেখাতেন। ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়ানোই নেতৃত্বের চূড়ান্ত পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় পাশ করা দূরের কথা, পরীক্ষাকেন্দ্রের গেট পর্যন্ত আসার সাহসও তারেক দেখাননি।
ইতিহাস এখানেই নির্মম। হাসিনার মুখোমুখি হওয়ার মল্লযুদ্ধ তো অনেক দূরের কথা, তিনি সেই সম্ভাবনাটুকুও এড়িয়ে গেছেন। পুটি মাছের প্রাণ নিয়ে বোয়ালের সামনে দাঁড়ানো যায় না, এই অজুহাত রাজনীতিতে সাহসের বিকল্প হতে পারে না।
গ্রাম্য বিচারে বা পাড়ার ঝগড়ায় আমরা প্রায়ই দেখি, মারামারি শেষ হলে কেউ এসে গলা চড়িয়ে বলে, আমি এসে পড়েছি, কোনো বাপের পুত গোলমাল করে দেখাক। তখন লোকজন হাসে। সবাই বোঝে লোকটা দেরিতে এসেছে এবং সাহসের জায়গায় সে কেবল শব্দ জোগাড় করেছে।
তারেকের এই ফেরা ঠিক তেমনই। ক্ষমতা সরে গেলে, ভয় কেটে গেলে, মাঠ ফাঁকা হলে নেমে পড়া কোনো বীরত্ব নয়। এটা সময় চিনে নেওয়া, ঝুঁকি এড়ানো, নিরাপদে ছবি তোলার রাজনীতি।
বাংলায় আমরা জানি, বাঘ না থাকলে বনে শিয়ালই রাজা হয়। যে বনে হাসিনা নেই, সে বনে তারেক রাজা হলে তার মর্যাদা শিয়ালের চেয়ে এক ধাপ বেশি হতে পারে, বাঘের নয়।
আজ যে রাজকীয় সংবর্ধনা হচ্ছে, তা আসলে শিয়াল রাজার সংবর্ধনা। এতে উল্লসিত হওয়ার আগে ইতিহাস মনে রাখা দরকার। ইতিহাস বলে, সাহস দেখানো হয় শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে, শূন্যতার ভেতর দিয়ে হেঁটে নয়। ইতিহাস বলে, দেরিতে আসা আওয়াজকে মানুষ হাততালি দেয় বটে, কিন্তু তা নেতৃত্বের প্রমাণ হিসেবে ধরে না।
ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়া সহজ। তাতে কেউ নিজেকে মেসি ভাবতেই পারে। গ্যালারিতে হাততালি ওঠে, ছবিও ভালো আসে। কিন্তু শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ হয় তখনই, যখন রোনালদোর সামনে দাঁড়িয়ে গোল দিতে হয়। যখন প্রতিপক্ষ চোখে চোখ রেখে দাঁড়ায়, যখন হারার ঝুঁকি বাস্তব, তখনই খেলোয়াড়ের আসল মান বোঝা যায়। প্রতিপক্ষ না থাকলে উল্লাস হয়, বিচার হয় না। জয় তখন কেবল শব্দ আর ভঙ্গি হয়ে থাকে, অর্জন হয়ে ওঠে না।
রাজনীতিও এর ব্যতিক্রম নয়। ক্ষমতা সরে গেলে, ভয়ের মেয়াদ শেষ হলে, মাঠ পরিষ্কার হলে ফিরে আসা কোনো দুঃসাহসিক অভিযান নয়। সেটা নিরাপদ প্রবেশ। সাহস ছাড়া প্রত্যাবর্তন কেবল প্রত্যাবর্তন নয়, এটা বিলম্বিত উপস্থিতি। আর বিলম্বিত উপস্থিতিকে ইতিহাস কখনো বীরত্ব বলে স্বীকৃতি দেয় না। ইতিহাস নির্মমভাবে হিসাব রাখে কে কখন দাঁড়িয়েছে, কার সামনে দাঁড়িয়েছে, আর কী ঝুঁকি নিয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়াটা হলো নিরাপদ সিদ্ধান্ত, কিন্তু নিরাপদ সিদ্ধান্ত কখনো সাহসের নামান্তর হতে পারে না। আজকের এই উল্লাস আসলে প্রতিপক্ষহীন আনন্দ। যে লড়াইটা হয়নি, সেই লড়াইয়ের গল্প বানিয়ে নেওয়া।
ইতিহাস এখানে খুব সোজা ভাষায় কথা বলে। বাঘের সামনে দাঁড়ানো যায়নি বলে যখন বাঘ সরে যায়, তখন গর্জন শুরু হয়। বনে বাঘ না থাকলে শিয়াল রাজা হয়, এতে নতুন কিছু নেই।
শিয়াল রাজা হওয়াকে যদি বাঘের বীরত্ব বলে চালানো হয়, তখনই ইতিহাস আপত্তি তোলে। তাই এই প্রত্যাবর্তনকে যারা সাহসের প্রতীক বানাতে চান, তাদের মনে রাখা দরকার, সাহস সময় দেখে আসে না। সাহস আসে বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। বাকিটা কেবল দেরিতে আসা কণ্ঠস্বর, যা কিছুক্ষণ শোনা যায়, কিন্তু দীর্ঘদিন মনে থাকে না।
এখানে আরেকটি কঠিন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়:
নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈধতা। একজন নেতা কেবল অনুপস্থিতি বা প্রত্যাবর্তনের তারিখ দিয়ে মূল্যায়ন হন না; তিনি কী নীতিতে থাকেন, কীসের বিরুদ্ধে দাঁড়ান তা দিয়ে হন।
সতেরো বছরের নির্বাসন যদি তাকে দেশের ভেতরের সংগ্রাম, মানুষের দৈনন্দিন যন্ত্রণা থেকে বিচ্ছিন্ন করে থাকে, তবে সেই ফিরে আসা শুধু ভৌগোলিক।
রাজনীতি মাঠে দাঁড়িয়ে রক্ত-ঘাম ঝরানোর খেলা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রেস কনফারেন্সের নয়। ক্ষমতা হস্তান্তরের এই পর্বে সহজ বিজয়ের উদযাপন তখনই অর্থপূর্ণ হয়, যখন বিজয়ী নিজে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে ছিলেন। নইলে তা পরোক্ষভাবে অর্জিত, অন্যের তৈরি ফসল কুড়ানোর সামিল।
একটি জাতির সঙ্কটমুহূর্তে প্রকৃত নেতৃত্ব আসে সামনে থেকে ঝুঁকি নেওয়া থেকে, নয়তো পরিস্থিতি শান্ত হলে সুবিধাভোগী অবস্থান নেওয়া থেকে। ইতিহাসের পাতা ওজন করে দেখে: কে ঝড়ের সময় হাল ধরেছিল, আর কে শুধু ঝড় থামার পর নৌকায় চড়েছিল।
এই ওজনের ফারাকটাই সবচেয়ে গভীর, এবং এর বিপক্ষে কোনো পাল্টা যুক্তি খাড়া করা যায় না। কারণ তা বাস্তবতা, মতামত নয়।-সংগৃহিত























